সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রবাদী ও বিভেদমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সিঙ্গাপুরে কর্মরত দুই বাংলাদেশি শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করেছে দেশটির সরকার। তদন্ত শেষে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (আইএসডি)।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইএসডি জানায়, ২৫ বছর বয়সী তায়ানী মো. রিসাদ এবং ৩৭ বছর বয়সী শাহেদুল ইসলামকে জুলাই মাসে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত শেষে তাদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আইএসডির জানায়, রিসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের উগ্র ইসলামপন্থী লেখক শফিউর রহমান ফারাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে একাধিক পোস্ট করেছিলেন। ফারাবির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে শাহেদুল ইসলাম ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে উসকানিমূলক পোস্ট করেন। পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা সমর্থন না করা মুসলমানদের 'কাফির' আখ্যা দিয়ে বিভেদমূলক ধর্মীয় মতও প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছে আইএসডি।
তবে তদন্তে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যাতে বোঝা যায় তারা সিঙ্গাপুরে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আইএসডির এক মুখপাত্র বলেন, তাদের উগ্র ও বিভেদমূলক মতাদর্শ সিঙ্গাপুরের বহুজাতিক ও বহু-ধর্মীয় সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
আইএসডি আরও জানিয়েছে, এই দুই ব্যক্তি সিঙ্গাপুরে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে নেওয়া কোনো নিরাপত্তা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।
জানা গেছে, তারা দুজনই সিঙ্গাপুরের নির্মাণশিল্পে কর্মরত ছিলেন।
এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত ৮ জুলাই ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন ও তিনটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।
পরদিন তাদের ঢাকার আদালতে হাজির করে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা তারা স্বীকার করেছেন। তাদের যোগাযোগ, নেটওয়ার্ক এবং অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।
আদালতে রিসাদ দাবি করেন, ২০২৩ সালে ফেসবুকে দেওয়া কয়েকটি পোস্টের কারণে সিঙ্গাপুরে তাকে আটক করা হয়। তার জানান, পোস্টগুলো বাংলাদেশের আরেক ইসলামপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এবং সংগঠনটির নেতাকে ঘিরে ছিল।
রিমান্ড মঞ্জুরের সময় বিচারক তাদের উদ্দেশে বলেন, 'আপনারা তো রেমিট্যান্স যোদ্ধা। এসব বিষয়ে জড়ানোর প্রয়োজন কী ছিল?'
এর আগে সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার কয়েকটি ঘটনাও সামনে আসে। ২০২০ সালে এক বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিক অনলাইনে আইএস-সমর্থিত প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তার কাছ থেকে ভাঁজ করা ছুরি উদ্ধার করা হয়, যা তিনি বাংলাদেশে হামলায় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
এর আগে ২০১৬ সালে নির্মাণ ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে কর্মরত আট বাংলাদেশিকে একটি গোপন উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগে আটক করে আইএসডি। তদন্তে তাদের কাছে অস্ত্র ও বোমা তৈরির নথি পাওয়া যায়। একই ঘটনায় আরও পাঁচ বাংলাদেশিকে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট উপকরণ রাখার দায়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে সিঙ্গাপুরে কর্মরত ২৭ বাংলাদেশিকে জঙ্গি চক্র গঠনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাদেরও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।