কাছাকাছি সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রান্তে অবস্থান করছিলেন দুই জোড়া কিংবদন্তি। কোপা আমেরিকা খেলতে লিওনেল মেসি আর আনহেল ডি মারিয়ারা এসেছেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মারা। তারকা খ্যাতিতে, অর্থেবিত্তে হয়তো তারা তুলনীয় নন, তবে যেভাবে নিজ নিজ খেলার শীর্ষবিন্দুতে নিজেদের নিয়ে গেছেন এই খেলোয়াড়রা, যেভাবে হয়ে উঠেছেন বড় ম্যাচে দলের সাফল্যের নিউক্লিয়াস, তাতে তুলনাটা করাই যায়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে এই সংস্করণ থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন রোহিত, ডি মারিয়াও বলে রেখেছেন, কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফাইনালটা হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ ম্যাচ। টানা ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকা কলম্বিয়ার সামনে টানা তিন ফাইনাল খেলা আর্জেন্টিনা, যারা জিতেছে সবশেষ দুটো ফাইনালে। কলম্বিয়ার জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হারের পর থেকে। চক্রপূরণ করে আবারও কি সেই আর্জেন্টিনাতেই থামবে হলুদ ঢেউ, নাকি ডি মারিয়াকে শেষ ম্যাচটায় মাঠ ছাড়তে হবে হার নিয়েই? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া কোপা আমেরিকার ফাইনালে।
ভেন্যুর নাম হার্ড রক স্টেডিয়াম। এখানেই কোপা আমেরিকার ফাইনাল। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে রক সংগীতের ঝংকার, চিৎকার, সবই দেখেছে এই স্টেডিয়ামের চার দেয়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের শেষ ৯০ মিনিটে অবশ্য মাঠে রক মিউজিকের মূর্ছনাই দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেখানে পায়ের সঙ্গে হাত চলবে সমানতালে। কোপা আমেরিকার এই আসরে সবচেয়ে বেশি ফাউল করা দলটি কলম্বিয়া। এখন পর্যন্ত ৭৬টা ফাউল করেছে কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনার ফাউল সংখ্যা ৫৩। শুধু কলম্বিয়ার খেলোয়াড়রাই নন, সমর্থকরাও গ্যালারিতে মারপিট করেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর একদল কলম্বিয়া সমর্থক ডারউইন নুনেজের পরিবারকে হেনস্তা করছিলেন স্টেডিয়ামে, নুনেজ নিজে মাঠ ছেড়ে গ্যালারিতে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে সেমিফাইনালের শেষ বাঁশির পর খেলোয়াড়রা মারামারি করেছেন।
কম যান না আর্জেন্টিনার ফুটবলাররাও। চিলির মুরিসিও ইসলার পা টেনে ধরে ফাউল করে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন উইঙ্গার নিকো গঞ্জালেস। তার শুয়ে পড়ে ইসলার গোড়ালি চেপে ধরার দৃশ্য নিয়ে বিজ্ঞাপন বানিয়েছে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা সংস্থা নাইকি। আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল বৈতরণীটা পার হয়েছে বেশ স্বস্তিতেই, কানাডার বিপক্ষে ম্যাচটায় প্রতিপক্ষ আক্রমণাত্মক হলেও ছিল অনভিজ্ঞ আর শারীরিক ভাবেই খুব একটা আক্রমণাত্মক নয়। কলম্বিয়া ঠিক উলটো। প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করে খেলাটা তাদের একটা বৈশিষ্ট্য। যে কারণে হার্ড রক স্টেডিয়ামের ফাইনালটা রূপ নিতে পারে কোনো হেভি মেটাল ব্যান্ডের কনসার্টে, মারামারি যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক।
বড় কোনো চমক দেখাতে না চাইলে লিওনেল স্কালোনি খুব সম্ভবত আস্থা রাখবেন সেমিফাইনালের একাদশেই। লিওনেল মেসি আর জুলিয়ান আলভারেজের যুগলবন্দি আক্রমণভাগে, উইং ধরে উঠে আসবেন ডি মারিয়া আর মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণের প্রথম ঢেউটা রুখে দেবেন রদ্রিগো ডি পল। মেসির ছায়াসঙ্গী ডি পল মারামারিতেও অগ্রগামী। ফাইনালে তার পায়ের কাজের সঙ্গে হাতের কাজও বাড়তে পারে।
কোপা আমেরিকার বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক ফুটবলের প্রদর্শনী কমই দেখা গেছে এই আসরে। বাজে মাঠ, বাজে রেফারিং, প্রচুর ফাউল, দর্শক থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের মারামারি সবই হয়েছে নিয়মমাফিক। ফাইনালটাও এ রকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনা বা আশঙ্কাই বেশি। ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকলেই যেহেতু পেনাল্টি, তেমন কিছু হতেই পারে। লুসাইলের মতো মিয়ামিতেও ফাইনালটা টাইব্রেকারে গড়ালে বাজপাখি এমিলিয়ানো মার্তিনেজ তো আছেনই! দুদলের খেলোয়াড়দের ছাপিয়ে নায়ক বা খলনায়ক বনে যেতেন পারেন রেফারিরা। যে দলটা খেলা পরিচালনা করবে, সেই দলের ৫ জনই কিন্তু ব্রাজিলের!