আপনি যদি এই দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে থাকেন তবে অনন্ত আম্বানি এবং রাধিকা মার্চেন্টের মহাবিবাহ উৎসবে আপনিও অংশ নিয়েছেন। মার্চ থেকে শুরু হওয়া আনুষ্ঠানিকতার খুঁটিনাটি সব তথ্যে সয়লাব সামাজিক মাধ্যম থেকে মূলধারার গণমাধ্যম। বরের মায়ের একটি দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি দামি হার কিংবা রিয়ানা ও জাস্টিন বিবারের মতো বিদেশি তারকাদের বিয়ের আসরে নাচানো খবর হওয়ার মতো বিষয়ই বটে। আম্বানি পরিবারের প্রতি সদস্য আর অতিথি তারকা বহরের প্রত্যেকের ‘লুক’-এর চুলচেরা বিশ্লেষণে নিমজ্জিত হতে হয় সামাজিক মাধ্যমে ঢুকলেই। তবে আপনি যদি ‘ওয়েলথ পর্ন’-এ আসক্ত হয়ে থাকেন আম্বানি বিবাহের অনুষ্ঠানমালার বিরামহীন জাঁকজমক আপনাকে ক্লান্ত করবে না।
ধনসম্পদের এই অযাচিত প্রদর্শনকে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করতেই হলো। ‘ওয়েলথ পর্ন’ অবশ্য একটি প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। হিন্দি চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য নির্মাতা যশ চোপড়া তো বলেই ফেলেছিলেন, দর্শক পয়সা খরচ করে বড় পর্দায় দারিদ্র্য দেখতে আসবে কেন, তারা টিকিট কেটে নিজেদের যে স্বপ্ন কখনো পূরণ হওয়ার নয় তা দেখতে আসেন। বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেব হোক কিংবা নেটফ্লিক্সের ‘ব্রিজারটন’ বড়লোকের বিয়েতে কে কী পরল; কে কী পেল; কে কী খেলো- সে আলোচনা মুখরোচক ও উপভোগ্য। কারণ অতিধনীরা চাহিদার অনেক বেশি অতিরিক্ত অর্থ কীভাবে খরচ করেন তা দেখার বাসনা পৃথিবীর বাকি যে সিংহভাগ দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে তাদের থাকবেই। কিন্তু এই অতি প্রদর্শনের যুগে যখন হাতে হাতে পেশাদার ক্যামেরা ফোন, সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ, স্টোরি, শর্টস, রিলস আর পোস্টের মাধ্যমে নিজের প্রতি মুহূর্তে আপডেট দেওয়ার তাগিদ, তখন এই বিষয়টি এক ধরনের বিকারে রূপ নেয় কি?
এশিয়ার শীর্ষ ও পৃথিবীর শীর্ষ ১০ ধনীর একজন মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদের পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তৃতীয় ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান অনন্তের বিয়ের খরচের ব্যাপারে আম্বানিরা নীরব থাকলেও বিয়ের পরিকল্পনাকারীরা এরই মধ্যে ১১০০ থেকে ১৩০০ কোটি রুপি খরচ করার কথা জানিয়েছেন। ভারতীয় অনেক গণমাধ্যমের মতে খরচের পরিমাণটা প্রায় ৫০০০ কোটি রুপি। গুজরাটের জামনগরে প্রাকবিবাহ আনুষ্ঠানিকতা, ইতালি থেকে ফ্রান্সে জলপথে প্রমোদ ভ্রমণ এবং সবশেষে মুম্বাইয়ে চারদিনের বিবাহোৎসব, সব মিলিয়ে খরচ মাত্রা ছাড়ানোরই কথা। রিলায়েন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, বিয়ের এই জাঁকজমক ‘বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান মর্যাদার শক্তিশালী প্রতীক’। তবে এর সঙ্গে সবাই একমত পোষণ করছেন না। ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ থমাস আইজ্যাক এ আয়োজনকে ‘অশ্লীল’ বলে মন্তব্য করেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আইনিভাবে এটা তাদের টাকা হতে পারে কিন্তু এমন আড়ন্বরপূর্ণ খরচ ধরিত্রী মা এবং দরিদ্রদের বিরুদ্ধে পাপ।’
ওয়ার্ল্ড ইনেকুয়ালিটা ল্যাবের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে বিলিয়নিয়ারদের স্বর্ণযুগ চলছে এখন। দেশটিতে বিলিয়নিয়ারের বর্তমান সংখ্যা ২৭১ যা বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে শক্তিশালী। তাদের সামষ্টিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিশ্বের মোট সম্পদের ৭ শতাংশ। মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি বা সজ্জন জিন্দালরা এখন জেফ বেজোস এবং এলন মাস্কদের সঙ্গে ওঠাবসা করছেন। তবে বিলিয়নিয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আরও যা বেড়েছে তা হলো ধনী-গরিবের বৈষম্য। এই বৈষম্য এখন এত প্রকট যে, গবেষণায় বলা হয়েছে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ধনী-গরিবের উপার্জনের সমতা বেশি ছিল। গবেষণা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘ভারতের আধুনিক বুর্জোয় শ্রেণির কর্র্তৃত্বাধীন বিলিয়নিয়ার রাজ উপনিবেশিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত ব্রিটিশ রাজের চেয়ে বেশি অসম।’
গবেষকরা আরও দেখেছেন, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর দেশটির মোট জাতীয় সম্পদের ৪০.১ শতাংশ প্রবেশগম্যতা রয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিলিয়নিয়ারদের এই উত্থান। গেল এক দশকে এমন সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধিত হয়েছে যা বড় ব্যবসা এবং সরকারের মধ্যে একটি নেক্সাস তৈরি করেছে। আর এর ফলে সরকার ও সমাজে ব্যবসায়ীদের লাগামহীন প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘বিলিয়নিয়ার রাজ’-এর ক্ষমতা প্রদর্শনের এক ফেটিশাইজড রূপ কি বেরিয়ে আসছে আম্বানি বিবাহ আয়োজনে? এখানে বলে নিই, ‘ফেটিশ’ হচ্ছে একটি মানবনির্মিত বস্তু যার ওপর দৈবশক্তি আরোপিত হয়। ১৮শ’ শতকের বুদ্ধিজীবীরা ফেটিশিজম তত্ত্বকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ঔপনিবেশিক শাসনের রমরমার সেই কালে জার্মান তাত্ত্বিক হেগেল বলেছিলেন, আফ্রিকানরা বিমূর্ত চিন্তায় অপারগ, তাদের চিন্তা ও কর্ম প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত এবং যে কোনো বস্তুর ওপর তারা ইচ্ছামতো কাল্পনিক শক্তি আরোপ করতে পারে।
আম্বানিরাও যেন তাই করছেন। কোনো দৈবশক্তির বলে টনি ব্লেয়ার থেকে মার্ক জাকারবার্গ, জন সিনা থেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর শাহরুখ খান তো বটেই হাজির হয়ে যাচ্ছেন বিয়ের অনুষ্ঠানে। সংগীত অনুষ্ঠানে পালে পালে তারকা মঞ্চে উঠে নাচছেন। কিম কার্দাশিয়ান এসেছেন বোন ক্লোয়ি কার্দাশিয়ানকে নিয়ে, সেই সঙ্গে এসেছে তার পুরো শুটিং ইউনিট। কারণ ভারতীয় মহাবিবাহের আয়োজনে অংশ নেওয়ার পুরো বিষয়টি হয়তো তিনি দেখাবেন তার জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো ‘কিপিং আপ উইদ কার্দাশিয়ান্সে’। আর এই ফেটিশিজমের অংশ হচ্ছি আমরাও। ‘বড়লোকি’র স্বাদ নিতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি এই জাঁকজমকের পেছনে বৈষম্যের দাঁতাল চোয়াল কেবল বড় হচ্ছে আর গিলে খাচ্ছে গরিবের টিকে থাকার একটুখানি সহায়।
লেখক : সাংবাদিক
naziabdafrin@gmail.com