গেমস উদ্বোধনের আগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে অলিম্পিক ফুটবল

ক্যালেন্ডারের পাতায় অপেক্ষা ২৬ জুলাইয়ের। প্যারিসের সেইন নদী থেকে শুরু হয়ে বিশ্বখ্যাত স্থাপনা আইফেল টাওয়ার সব মিলে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী আয়োজনের মাধ্যমে পর্দা উঠবে ‘দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ অলিম্পিক গেমসের ২০২৪ আসরের। তার জন্য অপেক্ষার প্রহর আরও দুদিন হলেও ফুটবলপিয়াসীদের অলিম্পিক শুরু আজ থেকেই। ইউরো ও কোপা আমেরিকার জৌলুস ফুরোনোর আগেই এ যেন আরও একবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে বুঁদ হওয়ার সুযোগ। আয়োজক রাষ্ট্র ফ্রান্সের ৭টি শহরজুড়ে আজ থেকে শুরু হবে অলিম্পিক ফুটবল। আর এই উত্তেজনার শেষটা হবে পার্ক দ্যা প্রিন্সেসের ফাইনালের মধ্য দিয়ে।

১৯৮৮ অলিম্পিক পর্যন্ত মূল জাতীয় দলটাই অংশ নিত ফুটবল ইভেন্টে। ১৯৯২ থেকে ফুটবলে বয়সের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। সেই থেকে বিভিন্ন দেশের অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলে আসছে অলিম্পিক ফুটবল। তবে তিনজন ২৩ বছরের ঊর্ধ্বে খেলোয়াড় থাকতে পারেন অলিম্পিকের দলে। এবারের আসরে দ্যুতি ছড়াতে পারেন যারা এমন তারকাদের মধ্যে আছেন কোপাজয়ী আর্জেন্টিনার জুলিয়ান আলভারেজ, ইউরোজয়ী স্পেনের ফেরমিন লোপেজ এবং গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোর আশরাফ হাকিমি।

জুলিয়ান আলভারেজ (আর্জেন্টিনা) : প্যারিস অলিম্পিকে স্বর্ণ জেতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দলটির নাম আর্জেন্টিনা। হাভিয়ের মাশচেরানোর অধীনে এ দলটিকে জ্যেষ্ঠ খেলোযাড়দের মধ্যে দলে নিকোলাস ওতামেন্দি এবং গোলরক্ষক জেরোনিমো রুলির সঙ্গে রাখা হয়েছে আলভারেজকেও। টানা দ্বিতীয় কোপা শিরোপা ঘরে তোলার আসরে আলভারেজের পা থেকে এসেছে দুটি গোল যার একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালে। ম্যানচেস্টার সিটির এই ফরোয়ার্ড পেপ গার্দিওলার অধীনে ৩৬টি ম্যাচে ১১ বার গোলের দেখা পেয়েছেন। স্বভাতই আর্জেন্টিনার তৃতীয় স্বর্ণের খোঁজে ২৪ বছরের আলভারেজ হয়ে উঠবেন মাশচেরানোর তুরুপের তাস।

ফেরমিন লোপেজ (স্পেন): ইউরোর চতুর্থ শিরোপা ঘরে তোলা স্পেনের যে দুজন অলিম্পিক মাতাতে ফ্রান্সে এসেছেন তাদের অ্যালেক্স বেইনা ও অন্যজন ফেরমিন লোপেজ। ইউরোয় স্পেনের মূল একাদশে খুব একটা সুযোগ পাননি ফেরমিন। গ্রুপপর্বে আলবেনিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের ম্যাচে খেলেছিলেন ২৮ মিনিট। ২১ বছরের এ উইঙ্গার অলিম্পিক দলে সঙ্গে পাচ্ছেন নিজের ক্লাব বার্সেলোনার সতীর্থ পাউ কুবারসি ও এরিক গার্সিয়াকে। নিজের প্রথম লা লিগা মৌসুমে জাভির অধীনে ১১ বার জালের দেখা পেয়েছেন ফেরমিন। এবার স্পেন অবধারিতভাবে স্বর্ণ জয়ের পক্ষে ফেভারিট দলগুলোর একটি। আর এমনটা যদি হয় তাহলে বেইনা ও ফেরমিন হবেন ইতিহাসের প্রথম দুজন ফুটবলার যারা একই গ্রীষ্মে ইউরো ও অলিম্পিক জেতার কীর্তি গড়তে সক্ষম হয়েছেন।

আশরাফ হাকিমি (মরক্কো): ফুটবল বিশ্বের আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সুনাম খুব একটা কখনোই ছিল না। হাকিমিদের নৈপুণ্য দিয়েই এবারের কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লিখেছে দেশটি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার পর ফ্রান্সের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে মন জিতে নিয়েছে সবার। হাকিমি নিজেও খেলে থাকেন প্যারিসের ক্লাব পিএসজিতে। ২৫ বছরের এ ফুটবলার এবারে চেনা পরিচিত মাঠগুলোতে নামতে যাচ্ছেন নিজের দেশের জার্সি গায়ে। মরক্কোর অলিম্পিক দলটির কোচ হলেন তারিক সেকটিউই। আটলাস লায়নসরা অনূর্ধ্ব-২৩ আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস জিতে নাম লিখিয়েছে অলিম্পিকে। আর বাকি পথটুকু পাড়ি দিতে তারিকের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হতে যাচ্ছেন হাকিমি।

অলিম্পিকের পুরুষ ফুটবলে থাকলেও নারী ফুটবলে অবশ্য বয়সের কোনো সীমা নেই। আসরটিতে সবচেয়ে সফল দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তারা চারবার জিতেছে স্বর্ণপদক। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় কানাডা। গত নারী বিশ্বকাপ ঘরে তুলে অলিম্পিকে প্রথম স্বর্ণ জেতার পথে নিজেদের ফেভারিট অবস্থানে নিয়ে এসেছে স্পেন। সেই দলের আইতানা বোনমাতির মতো এবারের অলিম্পিকে নিজের অবস্থান আর শিখরে নিয়ে যেতে প্রস্তুত ব্রাজিলের মার্তা ও কলম্বিয়ার লিনডা কাইসেডো।

আইতানা বোনমাতি (স্পেন): এর আগে কখনোই অলিম্পিক ফুটবলে অংশ নেয়নি স্পেনের নারী দলটি। প্রথমবারের মতো অংশ নিতে এসেই আসরের ফেভারিট দলগুলোর একটি স্পেন। তার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। নারীদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন গত বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকে এ পর্যন্ত খেলা ১৪ ম্যাচে হেরেছে মাত্র দুটিতে। মোন্টসে টোমের এই দলটি তারকায় ঠাসা। তারপরও সবগুলো চোখ খুঁজে নেবে আইতানা বোনমাতিকে। ২০২৩ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ী এ তারকা সবচেয়ে বেশি পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের হাল ধরতে পারার সামর্থ্যরে কারণে। বিশ্বকাপ, নেশনস লিগ এবং বার্সেলোনার হয়ে টানা চার ক্লাব শিরোপা জেতার পর এ তারকা আরও একটি স্বর্ণপদক গলায় ঝুলাতে পারেন কি না সেটিই এবার দেখার বিষয়।

মার্তা (ব্রাজিল): ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ১৮৩ ম্যাচে ১১৮টি গোল রয়েছে মার্তার নামের পাশে। দেশটির নারী ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলস্কোরার ফুটবলারটিও তিনিই। প্যারিস অলিম্পিকে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন কিংবদন্তি মার্তা। ৩৮ বছরের মার্তার সংগ্রহে আছে অলিম্পিক ফুটবলের দুটি রৌপ্য পদক। ২০০৪ অ্যাথেন্স এবং ২০০৮ বেইজিং আসরে তীরে এসে তরী ডুবেছিল ব্রাজিলের। গত টোকিও অলিম্পিকে অলিম্পিক ইতিহাসে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করে অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন। ব্রাজিলেরও দায়শোধের পাল্লা ভারী হয়েছে। নিজেদের সেরা খেলোয়াড়টিকে স্বর্ণজয়ের মাধ্যমে বিদায় জানাতে উঠেপড়ে নামবেন আর্থার ইলিয়াসের দলের বাকিরাও।

লিনডা কাইসেডো (কলম্বিয়া) : মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ২০২৩ নারী বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার জার্সিতে পাঁচটির সবগুলো ম্যাচেই নেমেছিলেন লিনডা। আন্তর্জাতিক নারী ফুটবলে এরই মধ্যে উঠতি তারকাদের একজন রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড ১৮ বছর ১৫৩ দিন বয়সে বিশ্বকাপে গোল করে গড়েছেন লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় কনিষ্ঠ গোলদাতার কীর্তি। তার সামনে আছেন কেবল মার্তা। জার্মানির বিপক্ষে তার আশ্চর্য সুন্দর গোলটি কেবল আসরের সেরা গোলের পুরস্কারই জেতেনি, পুসকাস অ্যাওয়ার্ডের জন্যও হয়েছিল মনোনীত। কলম্বিয়া ফুটবলের এ পোস্টার গার্ল নিজের প্রথম অলিম্পিকে সেই দ্যুতির রেশই টেনে নিতে চাইবেন।