অলিম্পিকে এবার ৩২টি খেলার নানা দূরত্ব, বিভাগ এবং ওজনশ্রেণিতে ৩২৯টি ইভেন্টের শ্রেষ্ঠত্বের নিষ্পত্তি হবে। সব মিলিয়ে বিশাল এই ক্রীড়াযজ্ঞে প্রতিটা মেডেল একই রকম সম্মান বয়ে আনলেও ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখ অলিম্পিক এলেই খোঁজে বিশেষ কিছু ইভেন্টকে। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে ১০০ মিটার দৌড় অলিম্পিকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট। কে হবেন এই গ্রহের দ্রুততম মানব, সেদিকে যেমন চোখ থাকে সবার তেমনি নীল জলের রাজ্যে সেরা সাঁতারুকে সেদিক থেকে নজর সরানো কঠিন। অলিম্পিকের বাস্কেটবলে যুক্তরাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য কী এবার ভাঙা সম্ভব? কারণ গত বছর বাস্কেটবল বিশ্বকাপে তো যুক্তরাষ্ট্র হয়েছে চতুর্থ। আকর্ষণীয় কিছু ইভেন্টে সোনার মেডেলের জন্য মূল লড়াইটা হবে কাদের ভেতর, সেটাই বাছাই করে ছেঁকে আনা দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য।
টোকিও অলিম্পিকে সোনার মেডেল জিতে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন ইতালির লেমন্ট মার্সেল জ্যাকবস। সেই ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে গ্রেট ব্রিটেনের অ্যালান ওয়েলস পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতেছিলেন। এরপর মেডেলটা শুধু উত্তর আমেরিকা মহাদেশেই ছিল সীমাবদ্ধ, মূলত অভিবাসী আফ্রিকানদের মধ্যেই। কার্ল লুইস, ডনোভান বেইল, মরিস গ্রিন, জাস্টিন গ্যাটলিন হয়ে উসেইন বোল্টের টানা তিন অলিম্পিকে সোনা জয়ের পর ইতালির জ্যাকবস জিতলেন টোকিওতে। প্যারিসে অংশ নিচ্ছেন জ্যাকবসও তবে ডায়মন্ড লিগে তার টাইমিংকে পেছনে ফেলেছেন অনেকেই। এবার পুরুষদের ১০০ মিটার দৌড়ে সোনাজয়ী হিসেবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নোয়াহ লাইলসকে। ২০ জুলাই, লন্ডনে ডায়মন্ড লিগের প্রতিযোগিতায় লাইলসের টাইমিং ছিল ৯.৮১ সেকেন্ড। অলিম্পিকে কি হবে এই নিয়ে জানতে চাইলে লাইলসের উত্তর ছিল, ‘আমি জিতব। আমি সবসময় এটাই করে আসছি।’ অনেকটা উসেইন বোল্টের মতোই লাইলসও ২০০ মিটারে সেরা, তবে ১০০ মিটারেও তার টাইমিং দুর্দান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক ট্রায়ালে তার টাইমিং ছিল ৯.৮৩ সেকেন্ড। লন্ডনে সেটা কমেছে। অলিম্পিকের ট্র্যাকে লাইলস যদি এই টাইমিং ধরে রাখতে পারেন তাহলে ২০ বছর পর অলিম্পিকের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতবে যুক্তরাষ্ট্র।
নারীদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে জ্যামাইকান আধিপত্য ভেঙে দিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের শাকারি রিচার্ডসন। এবারই প্রথম অলিম্পিকে অংশ নেওয়া এই স্প্রিন্টার ইউএস ট্রায়ালে ১০.৭১ সেকেন্ড টাইমিং করে হয়েছেন প্রথম। তাকে কড়া টক্কর দিতে হবে জ্যামাইকার শেরিকা জ্যাকসন আর পঞ্চম অলিম্পিকে অংশ নেওয়া শেলি-অ্যান ফ্রেজার-প্রাইসের সঙ্গে। এই ৩৭ বছর বয়সেও ১০.৯৪ সেকেন্ড টাইমিং করে জ্যামাইকার জাতীয় ট্রায়ালে তৃতীয় হয়ে প্যারিসের টিকিট নিশ্চিত করেছেন বেইজিং ও লন্ডন অলিম্পিকের সোনাজয়ী। পুরুষদের ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলে দৌড়েও সোনার মেডেলের প্রধান দাবিদার যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মূল লড়াইটা জ্যামাইকার সঙ্গেই। তবে কানাডা এবং ইতালিকেও বাদ দেওয়ার উপায় নেই। নারীদের ১০০ মিটার রিলেতেও পদকের লড়াইটা জমবে গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র আর জ্যামাইকার মধ্যেই। সাঁতার নিয়ে এবার ফরাসিদের অনেক আশা। প্যারিসের নতুন করে সাজানো লা ডিফেন্সে এরিনার স্টেট অব দ্যা আর্ট সুইমিং পুলে হবে অলিম্পিকের সাঁতার প্রতিযোগিতা। সেখানে লিওঁ মারশাঁকে নিয়ে একাধিক মেডেলের স্বপ্ন দেখছে স্বাগতিকরা। ২২ বছর বয়সী এই সাঁতারু ২০০ মিটার বাটারফ্লাই, ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে ও ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং সবশেষ ইভেন্টের বিশ্বরেকর্ডের মালিক।
সাঁতার শুরুর তারিখেই রাতে নারীদের ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইল ইভেন্টের মেডেল নিষ্পত্তি হবে। সেরাতে পুলে ঝড় তুলবেন অস্ট্রেলিয়ার আরিয়ানে তিতমুস, কানাডার সামার ম্যাক্লিন্টশ, যুক্তরাষ্ট্রের কেটি লেডেস্কি আর নিউজিল্যান্ডের এরিকা ফেয়ারওয়েদার। তিতমুসের কাছেই আছে ২০২৩ সালে গড়া বিশ্বরেকর্ডের তকমা, তবে বাকি তিনজনের যে কেউই হারিয়ে দিতে পারেন তিতমুসকে। নারীদের ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে মূল লড়াইটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের রেগান স্মিথের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কাইলি ম্যাককিওনের মধ্যে। পুরুষ ১০০ মিটার বাটারফ্লাইতে সময়ের সেরা সব সাঁতারুকে দেখা যাবে জলের ভেতর ঢেউ তুলতে। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেসেলের সঙ্গে তারই ট্রেনিং পার্টনার জশুয়া লিয়েন্ডো, হাঙ্গেরির ক্রিস্টফ মালিক, টোকিওতে ব্রোঞ্জজয়ী নোয়ে পন্টি; প্যারিসে জিততে পারেন যে কেউই। অ্যাথলেটিকস এবং সাঁতারের পর অলিম্পিকের অন্যতম আকর্ষণীয় আসর জিমন্যাস্টিকস। সোনার মেডেলের জন্য বেশিরভাগ ইভেন্টেই যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, তবে জোর লড়াই হবে ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স এবং চীনের সঙ্গে। মার্কিন তারকা সিমোনা বাইলসের পাশাপাশি ব্রাজিলের রেবেকা আন্দ্রে, চীনের চিউ চিউয়ান, আলজেরিয়ার কাইলিয়া নামুরকে দেখা যেতে পারে পোডিয়ামে।
দলগত খেলায় ফুটবলের পর বাস্কেটবলই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। ফুটবলে ইউরোজয়ী স্পেনের অলিম্পিক দলে অবশ্য লামিনে ইয়ামালরা নেই, তবে স্প্যানিশ তারুণ্যের প্রতিভাটা বোঝা গেছে ইউরোর মঞ্চে। অলিম্পিকে স্বাগতিক ফ্রান্স, কোপা আমেরিকা জয়ী আর্জেন্টিনার সঙ্গে স্প্যানিয়ার্ডদেরই মূল লড়াই হবে সোনার মেডেলের জন্য। বাস্কেটবলে ফুটবলের মতো বয়সের বাধা না থাকায় সেরা তারকারা খেলেন, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জমজমাট। বাস্কেটবলে ২০টি সোনার মেডেলের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র জিতেছে ১৬টি, তাদের টানা চার শিরোপার সাম্রাজ্যে এবার স্বাগতিক ফ্রান্স ও ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন জার্মানিও হানা দিতে পারে। স্টেফ কারি, কেভিন ডুরান্ট, জেইসন টাটুমদের নিয়ে গড়া মার্কিন দলটাকে স্বাগতিক হিসেবে কড়া টক্কর দিতে পারে টোকিওর রুপাজয়ী ফ্রান্স দল। এবার তারা পেয়েছে প্রজন্মের প্রতিভা ভিক্টর ওয়েমবেনিয়ামাকে। এনবিএর এই বছরের সেরা তরুণ প্রতিভার পুরস্কার পেয়েছেন ২০ বছরের এই ফরাসি তরুণ। ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ জেতা জার্মানিও কি ছেড়ে কথা বলবে? সব মিলিয়ে দারুণ লড়াই হবে বাস্কেটবল কোর্টে। কারণ সবারই নজর সোনার মেডেলে।