বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়ে একটি বিস্কুট মুখে দিয়ে আর খাওয়া হলো না ইকরাম হোসেন কাউছারের। বিস্কুট মুখে নিয়ে সড়ক পার হওয়ার সময় পিছন থেকে মাথায় গুলি করে পুলিশ। মুহূর্তেই ইকরামের মগজ ছিটকে পরে সড়কে। দূর থেকে দেখে ঠেলাওয়ালা দ্রুত এগিয়ে এসে মগজগুলো পলিথিনে নেন। এমন ভাবেই বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি বর্ণনা করছিলো ছোট ভাই ইমরান হোসেন ফারুক। ১৮ জুলাই কোটা বৈষম্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ঢাকা কবি নজরুল কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন কাউছার।
নিহত ইকরামের বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, ”সামান্য স্কুল শিক্ষক হয়ে তিনি তিন সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে যাচ্ছিলেন। তার বড় ছেলে ইকরাম এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে মেধাবী হওয়ায় ঢাকা কবি নজরুল কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স পড়ছিল। জমি বিক্রি করে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছিলাম। ছেলের স্বপ্ন ছিল মাস্টার্স শেষ করে সে বিসিএস এ অংশগ্রহণ করবে। পুলিশের গুলিতে তার স্বপ্ন অংকুরে বিনষ্ট হল। তিনি প্রশ্ন করেন ছেলে হত্যার দায় কে নেবে?”
গত বুধবার (১৭জুলাই) ও বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) দু'দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ম্যাসগুলোতে রান্না বন্ধ ছিল। দু'দিন কিছু খেতে না পেরে কাউছার খাবারের জন্য ১৮ জুলাই শুক্রবার দুপুরে ম্যাস থেকে বের হয়। জুমার নামাজ শেষে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঠেলাওয়ালার দোকান থেকে চেয়ে ভাত খায় ইকরাম। পরে ঠেলাওয়ালা সেঁধে একরামকে রাতের খাবারের জন্য একটি বিস্কুটের প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। ইকরাম বিস্কুটের প্যাকেটটি নিয়ে সড়ক পার হতে যেয়ে প্যাকেটটি ছিঁড়ে একটি বিস্কুট মুখে দেয়। এমন সময় পিছন থেকে মাথায় গুলি করে পুলিশ। মুহূর্তেই ইকরামের মগজ ছিটকে সড়কে পরে যায়। দূর থেকে দেখে সেই ঠেলাওয়ালা দ্রুত এগিয়ে যেয়ে মগজগুলো পলিথিনে ভরে। পরে তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলে পাঠানো হয়।
এভাবেই বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি বর্ণনা করছিলেন ছোট ভাই ইমরান হোসেন ফারুক। তিনি বলেন , ”মৃত্যুর ২০ মিনিট আগেও বড় ভাই ইকরাম হোসেন কাউছার বাড়িতে ফোন করেছিলেন। কবি নজরুল কলেজ সংলগ্ন লক্ষীবাজার এলাকায় ভাই যে জায়গায় থাকতো সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় তার মোবাইলে চার্জ ছিল না। যেই ঠেলাওয়ালা ভাইকে ভাত খাইয়েছিল সেই ঠেলাওয়ালার ফোন থেকে বাড়িতে ফোন করে ইকরাম। সেই ঠেলাওয়ালাই ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদটি প্রথম বাড়িতে জানায়।”
ইমরান আরো বলেন, ”ভাইয়ার শেষ ফোন কলটি ছিল বাবার সাথে শেষ কথা। বাবাকে সে বলেছিল সে ভালো আছে। তার জন্য দোয়া করতে। ছোট ভাই মানে আমাকে (ইমরানকে) দেখে রাখতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরে আসবে ।”
ছেলের মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা রুমি আক্তার। অনেকটা বাকরুদ্ধ মা। ছেলের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
ইকরামের একমাত্র বোন জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ”আমাদের পরিবার খুবই গরীব। পড়ালেখা শেষ করে ইকরাম পরিবারে হাল ধরবে আমাদের দুঃখ ঘুচবে এমনটাই আশা করেছিলাম। এখন আমার ভাই নেই, আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই। আমরা আশা করব সমাজের বৃত্তবান ব্যক্তিরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন।”