বাংলাদেশের ফুটবলে দলবদলের হিসাবনিকাশ

ফুটবলের দলবদল মৌসুম শুরু হলেই ফুটবল-ভক্তরা পাগলপ্রায় হয়ে যায়। প্রতিদিন তারা নিউজ ওয়েবসাইট, সংবাদপত্র,  ক্লাব ওয়েবসাইট বা প্লেয়ারের সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্টে গিয়ে তাদের খবর নেয় যে কে কোথায় যাচ্ছে বা কোন দল কাকে নিচ্ছে। ফুটবল খেলার ৯০ মিনিট পর, যদি কোনো বিষয় নিয়ে উন্মাদনা থাকে, তাহলে এ বিষয়টিই উঠে আসবে।

এখন চলছে ফুটবলের দলবদল মৌসুম। এই ফুটবল ট্রান্সফার ব্যবসা বিলিয়ন ডলারের বাজার। ক্লাবগুলো খেলোয়াড় ট্রান্সফার করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে। কখনো কখনো তাদের বার্ষিক বাজেট শুধু একজন খেলোয়াড় ট্রান্সফার দিয়েই আয় হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলে এ ক্ষেত্রটি নিয়ে কাজ করা হয় না। বাংলাদেশের ফুটবল খেলোয়াড়দের ট্রান্সফারের সঙ্গে কোনো ট্রান্সফার ফি জড়িত থাকে না। এর প্রধান কারণ ক্লাব ও খেলোয়াড়রা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে চায় না। আপনি যদি এক বছরের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তাহলে ফিফার ট্রান্সফারের নিয়ম অনুযায়ী চুক্তি শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই অন্য ক্লাবের সঙ্গে ফ্রিতে কথা বলতে পারবে। খেলোয়াড়রাও তাদের পরবর্তী মৌসুমে চুক্তিমূল্য বাড়ানোর চেষ্টায় এ সুবিধাটি নেয়। কিন্তু দিনশেষে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন প্লেয়ারই এমন করতে পারে কিন্তু যারা পারফর্ম করে না, তাদের খেলতে হয় আগের মৌসুমের চেয়েও কম টাকায়।

ব্যতিক্রম গল্পও আছে। যেমন ২০২১ সালে মোহামেডান ৫ লাখ টাকা ট্রান্সফার ফি দিয়ে সাইফ স্পোর্টিং থেকে তরুণ জাফর ইকবালকে দলে নিয়েছিল। এটাই বোধ হয় বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলে একমাত্র ট্রান্সফার দিয়ে খেলোয়াড় কেনার নজির। সাইফ স্পোর্টিংই ছিল বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলে দলবদলের নিয়ম বুঝে টেকনিক্যালি চুক্তি করা প্রথম দল। জাফর, রহমত বা ইয়াসিন আরাফতের মতো নতুন প্লেয়ারদের পটেনশিয়াল বুঝে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির প্রথা তারাই শুরু করেছিল। ইয়াসিন আরাফাতের চুক্তিতে রিলিজ ক্লজ ছিল ১০ কোটি টাকার মতো। কেউ যেনো তাকে নিতে না পারে, এ জন্যই অর্থের পরিমাণ ছিল এতো বড়। তবে যদি তার রিলিজ ক্লজ বাংলাদেশ মার্কেটের সামর্থ্য অনুযায়ী হতো, তবে ২০২০ সালেই হয়তো বসুন্ধরা কিংসই তা দিয়ে দলে ভেড়াত। একজন বাম পায়ের লেফটব্যাকের বড়ই দরকার ছিল সেবার বসুন্ধরা কিংসের। এ জন্যই শেষমেশ তারিক কাজিকে লেফটব্যাকে খেলিয়েছিল ২০২১ সালের এএফসি কাপে মালদ্বীপে। তবে ফুটবল ট্রান্সফার সিস্টেমের যে লোন বা ধারের নিয়ম আছে, তার সবচেয়ে বড় সুযোগ তুলেছে বসুন্ধরা কিংস। ২০২০ সালে ১ বছরের লোনে ব্রাজিলের টপ ক্লাব ফ্লুমিনেন্স থেকে বাংলাদেশে খেলতে নিয়ে এসেছিল রবসন রবিনহোকে। পরে এই লোনের সময় আরও ১ বছর বাড়িয়েছিল কিংস। এই দুই বছরে রবসনেরই ফ্লুমিনেন্সের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে যায়। তাই তৃতীয় বছরে রবসনের মতো টপ খেলোয়াড়কে ফ্রিতেই সাইন করে নেয় কিংস। লোনের এই হিসাবে না এলে রবসনের মতো প্লেয়ার কখনোই এই বয়সে এই লেভেল থেকে খেলতে আসত না বাংলাদেশে। সে খেলতে আসে, কারণ সে চেয়েছিল গেমটাইম যেটা সে ব্রাজিলে পাচ্ছিল না। কিংস এ সুযোগটি লুফে নেয়, আর এখন তো রবসন নিজেই পছন্দ করে বাংলাদেশে খেলে।

তবে লোনের পদ্ধতি ব্যবহার করে কিংস যত না বিদেশি প্লেয়ার দিয়ে লাভবান হয়েছে, তার থেকে বেশি লাভবান হয়েছে দেশি প্লেয়ারদের বেলায়। শেখ মোরসালিনকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে লোনে পাঠায় মোহামেডানে খেলার জন্য, সেখানে গেমটাইম পেয়ে গোল দিয়ে জাতীয় দলে ঢুকে আজ রাতারাতি ফুটবলের পোস্টারবয় শেখ মোরসালিন। এ রকমভাবে কিংসের প্রথম দুই কিপারের মধ্যে এখন মেহেদী হাসান শ্রাবণ, সে লোনে এক বছর খেলেছে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদে। এবারের সিজনে কিংসে দেখা যাবে তিনজন এমন, গত সিজনে ব্রাদার্স ইউনিয়ন লিমিটেডে খেলা ইনসান, নয়ন এবং ৬ গোল করা নতুন স্কিলফুল উইংগার রাব্বি হোসেন রাহুল। সব প্লেয়ারের সঙ্গেই কিংসের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি কিন্তু এমন আনকোরা প্লেয়ারদের পরীক্ষিত প্লেয়ার বানিয়ে নিয়েছে এই লোন সিস্টেম ব্যবহার করে। চাইলেও কোনো ক্লাব এদের সাইন করতে পারবে না কিংসের পারমিশন ছাড়া।

বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলের শুরু ২০০৮ থেকে। কিন্তু ফিফাই পুরা বিশে^ দলবদলটাকে একটা কাঠামোয় আনতে সময় নিয়েছে ২০১২ সাল পর্যন্ত। বিদেশি খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমরা লক্ষ করেছি যে যারা বাংলাদেশে এসে খেলত হয় তারা ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে, কোনো দল পাচ্ছে না তাই খেলতে এসেছে অথবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে না এমন প্লেয়ার কিছু টাকা উপার্জনের সুযোগ হিসেবে এসেছে। এর মধ্যেও লি টাক বা সনি নর্দে এসে লিগটাকে উজ্জ্বল করেছে কিন্তু ওই হাতে গোনা দুই-একজন। তবে ২০১৮ থেকে ধীরে ধীরে বিদেশি খেলোয়াড়ের কোয়ালিটি বেড়েছে। এটি বেশ কয়েকটি ক্লাবের বিনিয়োগের কারণে। কিন্তু শীর্ষ শ্রেণির ভালো বিদেশি খেলোয়াড়দের সই করা সব সময়ই বাংলাদেশে একটি সমস্যা ছিল ফুটবল ক্যালেন্ডার কখনোই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ছিল না। বেশিরভাগ ফুটবল দেশে জুন-মে পর্যন্ত মৌসুম থাকে, যেখানে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ট্রান্সফার উইন্ডো। কিন্তু আগে বাংলাদেশে মৌসুম শুরু হতো সেপ্টেম্বরে, কখনো কখনো অক্টোবরে, এমনকি ডিসেম্বরেও। এটি ক্লাবগুলোর জন্য বাধা তৈরি করেছিল। কারণ তারা জানত না কখন মৌসুম শুরু হবে। উপরন্তু যখন বাংলাদেশের ট্রান্সফার উইন্ডো ছিল, তখন অন্য সব দেশে ফুটবল খেলা চলছিল। এভাবে শুধু সেই খেলোয়াড়দের পাওয়া যেত, যাদের কোনো চুক্তি নেই, যারা ভালো কোয়ালিটির খেলার মধ্যে নেই। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে জুন থেকে মে পর্যন্ত মৌসুম নির্ধারণ করেছে পেশাদার লিগ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। এটি বাংলাদেশকে ফুটবল ট্রান্সফার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে এখন থেকে। সাধারণ দর্শক এখনো সিজন এবং রেজিস্ট্রেশনের সময় ঠিক করার সুবিধাগুলো দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ এটি সম্প্রতি ঠিক করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যখন ক্লাবগুলো আগে থেকেই ক্যালেন্ডারটি জানবে, তখন এটি তাদের পরিকল্পনা করতে এবং ভালো মানের খেলোয়াড়দের সাইন করতে সহায়তা করবে। এটি ক্লাব এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে দেবে এবং তারা জানবে কখন মৌসুম শেষ হবে। এতে করে ক্লাবগুলোর অযথা খরচ অনেক কমে আসবে।