বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের মুখ

রিও অলিম্পিকে তিনি পেয়েছিলেন মশাল বাহকের সম্মান। টোকিও অলিম্পিকে উদ্বোধনে ভূষিত হন লরেল অ্যাওয়ার্ডে। চলমান প্যারিস অলিম্পিকও তার সামাজিক ব্যবসার আদর্শে মোড়ানো। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলে পরিচিত অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা বারবার ব্যর্থ হলেও এই বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করে চলছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

অলিম্পিক গেমসে বরাবরই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ থাকে। বিশেষ কোটা কিংবা ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে খেলার সুযোগ পান বাংলাদেশি অ্যাথলেটরা। তারপর গেমসের হিট থেকেই ফিরতে হয় বাড়ি। অলিম্পিক গেমস বাংলাদেশের জন্য তাই স্রেফ অংশগ্রহণ আর অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেই বাংলাদেশেরই একজন মানুষ অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন।

২০১৬ রিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষ ধাপে মশাল বহন করেছিলেন ড. ইউনূস। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সভায় বক্তব্যও রেখেছিলেন। এরপর ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে (২০২১ সালে অনুষ্ঠিত) ড. ইউনূসকে লরেল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শান্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি দিতে ২০১৬ সালে এই অ্যাওয়ার্ডের প্রবর্তন করা হয়। ড. ইউনূস ছিলেন এই অ্যাওয়ার্ড পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি।

চলতি প্যারিস অলিম্পিকে ড. ইউনূসকে আরও বড় সম্মান দেওয়া হয়। বিভিন্ন দিক দিয়েই এবারের আসরকে ব্যতিক্রম এবং টেকসই অলিম্পিক গেমস হিসেবে উল্লেখ করেছেন আয়োজকরা। ড. ইউনূসের ‘তিন শূন্য’ খ্যাত শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণকেই এবারের অলিম্পিকের মূল বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্যারিস ইএসএস (ইকোনমি, সোশ্যাল ও সলিডারিটি) ২০২৪ এবং সলিদেও নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার আদর্শে ইতিহাসের সবচেয়ে টেকসই অলিম্পিক গেমসে পরিণত করার।

এর আগে ২০১৭ সালে প্যারিস অলিম্পিক মূলমন্ত্র কী হবেÑ সেটা ঠিক করতে ড. ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানায় অলিম্পিক কমিটি। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, প্যারিসের মেয়র অ্যান হিদালগোকে নিয়ে গঠিত ‘প্যারিস অলিম্পিক টিম’-এর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিন সদস্যের এই দলটি লুজানে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে প্যারিস অলিম্পিকের মূলমন্ত্র উপস্থাপন করে।

পরবর্তী সময়ে আসরের সামাজিক ও টেকসই অভিঘাত নিশ্চিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত এই টিম জানায়, ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্যারিস অলিম্পিকের মোট উপকরণ সংগ্রহে ৪০০টি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তার পরামর্শ এবং রূপকল্প অনুযায়ীই নির্মাণ করা হয় প্যারিস গেমসের অলিম্পিক ভিলেজ। আসলে অলিম্পিক গেমসের জন্য যে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, বেশিরভাগ আয়োজক দেশই গেমস শেষে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু ইউনূসের পরামর্শে প্যারিস ভিলেজ নির্মাণের সময় এমন পরিকল্পনা করা হয়, যাতে অলিম্পিক শেষে এই কাঠামোগুলোকে নিম্নআয়ের মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ, সম্পদের অপচয় হবে না।

বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক বেশ পুরনো। ২০০৬ সালে বাংলাদেশে পা রেখেছিলেন পেলে, ম্যারাডোনার পরবর্তী যুগের ফুটবল মহাতারকা জিনেদিন জিদান। গ্রামীণ ব্যাংকের একটি প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী এই তারকাকে বাংলাদেশে এনেছিলেন ড. ইউনূস। দুই দিনের এই সফরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দেশের দুই শীর্ষ ক্লাব আবাহনী আর মোহামেডানের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সঙ্গে তিনি ফুটবলও খেলেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সে সময় সেটা ছিল অনেক বড় ঘটনা।

এবার ড. ইউনূস যখন ‘প্যারিস জয়’ করছেন, তখন বাংলাদেশে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে পতন হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। নতুন দিনের বাংলাদেশ গড়তে তরুণরা আস্থা রেখেছেন ড. ইউনূসের ওপর। ২০০৬ সালে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ প্যারিস অলিম্পিক থেকে ফিরেই দেশ গড়ার কাজে হাত দেবেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনও নিঃসন্দেহে তাকিয়ে থাকবে তার দিকেই।