তারুণ্যে আশা আগামীর 

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। স্বাধীনতার তিপ্পান্ন বছর পরেও আমরা ঠিক দাঁড়াতে পারিনি। মর্যাদাবান হয়ে উঠতে পারিনি বিশ্বাঙ্গনে। এই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা এসেছেন, তারা প্রায় সকলে আজীবন ক্ষমতায় থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছেন। শেখ হাসিনার সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। গত পনেরো বছরে এই সরকার দেশে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।  শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুথানে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। 

আজীবন ক্ষমতায় থাকতে প্রবল ক্ষমতার্জনের নেশায় প্রতিদ্বন্দ্বীর কন্ঠ রোধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্যায্যভাবে ব্যবহার করেছে এই সরকার। বিচার বিভাগকে স্বাধীন হতে না দিয়ে নিজেদের অধিকারে রেখেছে। এটি ব্যবহার করে বিরোধী মতাদর্শীদের জেলে পুরেছে খেয়াল-খুশিমত। ফরমায়েশি গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও রায়ের মাধ্যমে কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়েছে। ফলে দিনে দিনে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের চরম অনাস্থা তৈরি হয়েছে। 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীকে জনসেবার পরিবর্তে সরকার বিরোধীদের দমন-পীড়নে ব্যবহার করেছে। এটি নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে চামচামি ও অন্ধ আনুগত্যকে বিবেচনা করা হয়েছে। এরা তাই সরকারের ইশারায় জনগণের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করতেও দ্বিধা করেনি। সরকারকে সর্বক্ষেত্রে সুরক্ষা দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে এই বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যগণ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে যে-যেভাবে পেরেছে অর্থ কামিয়ে নিয়েছে। জনগণের বন্ধু তাই আর বন্ধু হয়ে ওঠেনি।

একইভাবে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও কখনোই স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতে দেয়নি সরকার। নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ করেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ভিন্নমত দমনে ছাত্র রাজনীতির নামে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে পেটুয়া বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে।  হলগুলোতে গড়ে ওঠেছে টর্চার সেল। সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আর নিরাপদ থাকেনি। নির্যাতন, চাঁদাবাজি, খুন ও ধর্ষনের মতো ঘটনা ঘটেছে অহরহ। 

এমনি করে প্রশাসনের সর্বস্তরে অযোগ্য, অদক্ষ, পদলেহনকারী চামচাদের নির্বিচারে পদায়ন করা হয়েছে। অসীম সরকারি আনুকল্য পেয়ে তারা নিজেদেরকে জনগণের সেবক না ভেবে প্রভু ভাবতে শুরু করে। তারা জনসেবার পরিবর্তে তাদের কর্তাদের তুষ্ট রাখতেই সময় পার করেছে। ফলে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে কাউকেই ভাবতে হয়নি। দেশের কথা না ভেবে সবাই যেকোন উপায়ে টাকা কামিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। 

ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে সরকার নিজেদের পছন্দমত লোক বসিয়ে নামে-বেনামে ঋণের নামে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে ভাগাভাগি করেছে। 

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মাত্রারিক্ত খরচ দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। সরকারের এমপি মন্ত্রীরা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এভাবে। অফিসের গাড়ি চালক, পিয়ন, দারোয়ান, হিসাবরক্ষকরাও অনেকে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দেশের সকল স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্ণীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ঘুষ ছাড়া কোন সরকারি সেবা পাওয়ার আশা নেই। 

মানুষের ভোটাধিকার পরিকল্পিতভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বারবার প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সরকারের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করে নেওয়া হয়েছে। মানুষের বাক স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। জেল, জুলুম, নির্যাতন ও গুম হওয়ার ভয়ে কেউ কিছুই বলার সাহস পায়নি। 

এভাবে ক্রমে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে সরকার বিরোধী ক্ষোভ দানা বাধতে থাকে। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্মে জনতা যোগ দিলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের বিদায় হলে দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ পায় দেশের আপামর জনতা। 

ছাত্ররা কোটা বাতিলের পর সরকার হটিয়েও ক্ষান্ত না দিয়ে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলনের মঞ্চেই রয়ে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে তা নিশ্চিত করে ফেরে। গত এক মাসের অরাজক পরিস্থিতিতে দেশের ক্ষয়ক্ষতি পোষানোর কাজে নিজেরা হাত লাগায়। আগামীর সরকার কেমন হবে সে ভাবনাও আছে তরুণদের মাথায়। প্রতিশ্রুতি আছে আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের কর্মকান্ড মনিটর করা হবে। যেকোন অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে তরুণ কণ্ঠ। তাই তারুণ্যেই আশা আগামীর।