২০১২ সালে ভারতের নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর সেখানকার নারী অধিকারকর্মী কবিতা কৃষ্ণান তার ‘Fearless Freedom’ বইতে উল্লেখ করেছেন, সমাজে নারীদের বাইনারি অপশন দেওয়া হয়। নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা। মানে নারীর যদি নিরাপত্তা লাগে তো সে তার স্বাধীনতা শিকিয়ে তুলুক আর তার যদি স্বাধীনতা লাগে তো নিরাপত্তা নিয়ে না ভাবুক! ২০২২ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের মেয়েদের ভালো বিয়ে হয় না উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন তিনি চান না তার শিক্ষার্থীদের ওপর কালিমা আসুক। রাতে অনেক সময় ঢাকা থেকে ফেরার পথে তিনি দেখতেন, রাস্তায় ছেলে মেয়েরা রাত ১২টার দিকে আড্ডা করছে, তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যদি কিছু একটি হয়ে যায় সেই নিরাপত্তার দায় ভিসির ওপরেই আসবে। শাবিপ্রবির উপাচার্য নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা (রাত ১২টায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া) ভার্সেস নিপীড়ন অপশন দিয়ে দিয়েছিলেন, সঙ্গে আরেকটা অপশন দিয়েছিলেন ‘ভালো মেয়ে হয়ে ওঠা’।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়- ধারাবাহিকভাবে বিগত বছরগুলোতে একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনা আমাদের সামনে আসছে। এই আসার পরিমাণ অল্প। মূলত যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ ছাত্রীই অভিযোগ করেন না। আর যারা করেন তাদের বেশির ভাগ অভিযোগের সুবিচার পান না। ২০২৩ সালের ৮ জুন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভায় শাবিপ্রবিতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলের দশ বছর ধরে ফোকাল হিসেবে যুক্ত থাকা অধ্যাপক ইয়াসমিন হক জানিয়েছিলেন, উপাচার্যের ওপর যৌন নিপীড়নের বিচার অনেকটা নির্ভর করে। উপাচার্যের ক্যাডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে তদন্ত প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে পাঠান না। ( তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৩)।
যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে কয়টা কাজ হয়ে থাকে: মুহূর্তেই মিডিয়ার নড়নচড়ন, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে কার্যকর করার আহ্বান, জনগণের থেকে আসা চাপ সামলাতে সাময়িকভাবে প্রশাসক কর্তৃক অভিযুক্তকে বহিষ্কার করা এবং শিক্ষার্থী, নারী এবং প্রগতিশীল মহলের বহুমাত্রিক আন্দোলন ইত্যাদি। এই গতিশীলতা ম্রিয়মাণ হতেই ঘটনার অন্য পিঠ শুরু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ক্ষমতাসীন দলের অভিযুক্ত যৌন নিপীড়ককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলেও, কারাবরণ শেষ করে নিম্ন আদালত থেকে জামিন নিয়ে ক্যাম্পাসের আশপাশেই দোকান জাঁকিয়ে বসেছিল। (তথ্যসূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, ১৩ জুন, ২০২৩)। যৌন নিপীড়নের ঘটনা যে মাত্রার বিস্ফোরণ তৈরি করতে পারে, মামলা করবার পরে একজন ভুক্তভোগী নারী যখন তারই চারপাশে সেই অভিযুক্তকে ‘হ্যাডম’ নিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে ফিরতে দেখে, তখন তার সেই ট্রমা আর বিপন্নতার খবর ততটা আলোড়ন তোলার ম্যাটেরিয়াল হয় না। সে মামলা কবে শেষ হয়, আদৌ শেষ হয়ে ভুক্তভোগীর কি প্রাপ্তি হয় কিংবা অভিযুক্তের অনুশোচনামূলক বিচার হয় কিনা এর বেশির ভাগ হদিস আমরা জানি না। যেসব মামলার সঙ্গে নারী অধিকার সংগঠনের লাগাতার সম্পৃক্ততা থাকে, কেবল সেসব মামলার রায় পাঁচ কিংবা দশ বছর পর পত্রিকার পাতার তৃতীয় পৃষ্ঠার শিরোনামে স্থান পায়। কিন্তু এই রায় প্রাপ্তিই কি আসলে ভুক্তভোগীর জন্য জাস্টিস? বিশ্ববিদ্যালয়য়ের লাগাতার নিপীড়নের যন্ত্রণাকে আর ‘ডিল’ করার উপায় না পেয়ে সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষার্থীর অবন্তিকার আত্মহত্যা আমাদের প্রথাগত ‘জাস্টিস’ এর ধারণাকে আরেকবার প্রশ্ন তুলে। এখানে এসে আমরা দেখতে পাই, দু চার বছর পর আদালত যদি কোন রায় দেয়ও, তা কোনোভাবেই আর অবন্তিকার জীবনটিকে ফিরে দিতে পারবে না।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের স্বনামধন্য ভিকারুননিসা স্কুলের আজিমপুর শাখার গণিত শিক্ষক মুরাদ হোসেনের দীর্ঘ সময়ব্যাপী বহু শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির বিষয়ে ওখানে অ্যান্টি হ্যারেজমেন্ট সেলে একাধিক অভিযোগ করার পরেও স্কুলের পক্ষ থেকে কেবল ‘ক্ষমা হিসেবে’ দেখার অফিস আদেশ এসেছিল। একাধিক ভুক্তভোগীর মামলা ও স্কুল গেটে ছাত্রীদের ‘ মুরাদ হোসেন সরকার, জেলে ভরা দরকার’ সুতীব্র স্লোগান শেষ পর্যন্ত ঘটনাটিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য করে এবং মুরাদ হোসেন জেলেও যান। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন অ্যান্টি হ্যারেজমেন্ট সেল থাকার পরেও শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু বিচার পায় না কিংবা হাইকোর্ট নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে কেন বিশ্ববিদ্যালয়য়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলগুলো কার্যকর হয় না?
শিক্ষাঙ্গনে ক্রমাগত যৌন নিপীড়ন এর ঘটনাগুলোকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তবে দেখা যাবে তা কেবল যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং আর তা বিচারের মধ্যে আওতাধীন থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষমতাসীনের স্বার্থ। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের যৌন হয়রানির ঘটনায় আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা দেখতে পাই। ঠিক একইভাবে এই ব্যক্তিদের আমরা সিট বাণিজ্য, হল বাণিজ্য, ডেভেলপমেন্ট এর নামে বিল্ডিং তৈরির টাকা ভাগ বাটোয়ারা, বিশ্ববিদ্যালয়য়ের লুটপাট, শিক্ষা বাণিজ্য এর মত ঘটনাগুলোতেও দেখতে পাই। সে শিক্ষক হোক কিংবা শিক্ষার্থী। এই ক্ষমতা এতই হাইভোল্টেজের অদম্য যে, সেখানে যেকোনো সাধারণ শিক্ষার্থীই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। তাই গেস্টরুম আর গণ রুমের নির্যাতন আমরা দেখি। বড় আপা আর ভাইদের যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে দলীয় মিছিলে তাদের অংশগ্রহণের অসহায়ত্ব দেখি। শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো ঘটা এবং অভিযোগের পরেও তা আড়ালে চলে যাওয়ার পেছনে রয়েছে এই প্রকাণ্ড ক্ষমতার এক দুর্ভেদ্য চক্র। যেখানে অভিযুক্তরা ‘প্রকাণ্ড ক্ষমতার’ ছায়াতে নিশ্চিন্তে থাকে, জানে তাদের গায়ে টোকা পড়বে না। এবং অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জানে এই সব ‘মামুলি’ যৌন হয়রানির ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না করলে কিংবা সেল অকার্যকর থাকলে কর্তৃপক্ষকে কোথাও জবাবদিহির মুখে পরতে হবে না। বলাই বাহুল্য, জবাবদিহির প্রসঙ্গটি হাইকোর্ট নীতিমালাতেও স্পষ্ট নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ৭৩ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না, সিনেট নির্বাচন হয় না (অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট নেই) এমনকি সিনেটের নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে উপাচার্যও নিয়োগ হয় না। বরং উপাচার্য হওয়ার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। খুব স্পষ্ট যে, একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই কাঠামোগত আলাপে ক্ষমতাসীন দল বাদে আর সমস্ত সাধারণ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর আলাপ ও অংশগ্রহণ অনুপস্থিত, অনেকটা দেশের বিদ্যমান ‘গণতন্ত্রের’ মতোই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই ‘স্বায়ত্তশাসন’।
শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির ক্রমাগত ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই ক্ষমতার আস্ফালন, অনিয়ম এবং অগণতান্ত্রিক চর্চাটি একেবারে মিলেমিশে আছে। যেখানে দলীয়করণের বলে একজন অনুপযুক্ত শিক্ষার্থীকে শিক্ষক বানানো যায়, ঠিক সেখানেই একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা যায়, যৌন হয়রানি করা যায়, অনৈতিক যৌন প্রস্তাবে সাড়া না দিলে ফেল করিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে ফেলা যায়।
যৌন হয়রানির ঘটনার সূত্রপাত লৈঙ্গিক আধিপত্যের মানসিকতা থেকে শুরু হলেও, এর পুষ্টিদাতা থাকে চরম অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এই পুরো ব্যবস্থাটি এমনই নিশ্ছিদ্র যেখানে গুটিকয়েক ‘নারীর প্রতি সংবেদনশীল’ ব্যক্তিরা থাকলেও, তা ঠেকানোর কোন রাস্তা থাকে না। তাই শিক্ষাঙ্গনের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন তো আবশ্যক। তারও পাশাপাশি আবশ্যক এই শিক্ষাঙ্গনগুলো যেভাবে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সে বলয়টিকে ভেঙে ফেলা।
লেখক: নারীবাদী অধিকারকর্মী
