৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় ঠায় নিল আরও একটি তারিখ। দিনটি দেশের ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন। সাধারণ মানুষের বিজয়ের দিন। আমাদের ছাত্রসমাজ আরও একবার শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল স্টুডেন্ট পাওয়ার কাকে বলে। ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪। এই সালগুলোতে আমাদের দেশে দাবি আদায়ের যে সংগ্রাম হয়েছে প্রতিটিতেই ছিল আমাদের ছাত্রসমাজ। প্রতিটি আন্দোলনই ছিল সফল। ফলে বলাই যায় রাজনীতিকরা রাষ্ট্রশাসন করেন বটে, সরকারের বিরোধিতা করেন বটে, কিন্তু তাদের প্রতিবাদের ভাষার চেয়ে ছাত্রদের প্রতিবাদের ভাষা অনেক জোরালো। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে বিক্ষোভ করেন, প্রতিবাদ করেন। আর ছাত্ররা প্রতিবাদ করেন সামগ্রিক স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে। এ কারণে তাদের দাবির সর্বস্তরের জনতার সমর্থন থাকে। জনতার সমর্থন যেখানে থাকে, তা ব্যর্থ হওয়ার নয়। জনতা দাবি আদায় করেই ছাড়ে। এবারও ব্যত্যয় ঘটেনি। ১৫ বছর ৬ মাসের আওয়ামী লীগের শাসন বিলুপ্ত হয়েছে মাত্র এক মাসের গড়ে ওঠা প্রতিবাদে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে গেছেন। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যখন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে এ কথা ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন রাজপথে লাখ লাখ জনতার ঢল। বিজয়ের আনন্দের স্ফুলিঙ্গ ছিল তাদের চোখেমুখে। কেউ কেউ বলেছেন এ যেন নতুন বাংলাদেশ। নতুনভাবে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ। ছাত্র-জনতার হাত ধরে আসা এই বিজয়ে সাধারণ মানুষ আনন্দে আত্মহারা হলেও যারা এই আনন্দের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা কিন্তু বলেছেন, তাদের বিজয় এখনো অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্র গঠনের কাজের প্রথম ধাপ পার করেছি। এখনো অনেক দূর যেতে হবে। সত্যিই তাই।
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ৮৪ বছর বয়সী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী, অর্থনীতিবিদ এবং ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা। গোটা বিশে^ বিশেষ করে পশ্চিমা বিশে^র কাছে তিনি একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আমাদের দেশে তাকে নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নানা অপপ্রচার করলেও, দেশের মানুষের কাছে তিনি একজন বিচক্ষণ এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অন্যতম। এ কারণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা প্রথমে তাকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এছাড়া ১৭ সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা করছেন তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে গ্রহণযোগ্য এবং বিচক্ষণ। ফলে আগামী রাষ্ট্রগঠনে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা বড় ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। যত সহজে এই কথাগুলো বলছি বিষয়গুলো অতটা সহজও নয়। স্বল্পতম সময়ে সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনের বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সরকার ব্যবস্থার ওপর যেসব কারণে জনগণ আস্থা হারিয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে হলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ফলে এই অল্প সময়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলতে হবে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। কারণ জনগণের তাৎক্ষণিক কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তা পূরণের জন্য উদ্যোগটা দেখতে চাইবে জনগণ। আওয়ামী লীগ শাসনামলে মূল্যস্ফীতি ছিল সাধারণ মানুষের বড় অস্বস্তির কারণ। করোনা পরিস্থিতির পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দোহাই দিয়ে নিত্যপণ্যের মূল্য লাগাম ছাড়িয়ে যায়। যদিও করোনা মহামারীর পর বিশ্ব পরিস্থিতি এমনই ছিল। কিন্তু বিশে^ উন্নতি ঘটলেও বাংলাদেশে হয়নি। এর মূল কারণ ব্যবসায়ীদের অব্যবসায়ী সুলভ মনোভাব। ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার মনোভাব, মজুদদারি এবং সিন্ডিকেটের কারণে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি এখন ১০-এর ওপর। যদিও দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সরকারের প্রতি আহ্বান ছিল সর্বস্তরের। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীদের পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানা অজুহাতে সাফাই গাইতে শোনা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ মুহূর্তে বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো হবে। যদিও শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি নাজুক ছিল। শ্রীলঙ্কাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রাথমিক শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারে মূল্যস্ফীতি হ্রাস। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ বিষয়ে অধিক মনোযোগী হওয়া জরুরি।
জনগণের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণ এমনটাই প্রত্যাশা করে। বিগত সরকারের সময়ে জননিরাপত্তার বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ছিল সরকারি বাহিনীর আধিক্য। ফলে সাধারণ মানুষ এবং ভিন্নমতের মানুষকে সর্বদা তটস্থ থাকতে হয়েছে। হত্যা, খুন, গুম, ক্রসফায়ার, নির্যাতন সবই হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এ পরিস্থিতির উন্নতি চায় সাধারণ মানুষ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘিরে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। কোটা আন্দোলন শুরুর পর পুলিশ বাহিনীর হাতে ছাত্র-জনতার নির্যাতন সাধারণ মানুষ এত সহজে এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে না। নির্বিচারে গুলি হয়েছে ছাত্র-জনতার ওপর। বহু প্রাণহানি ঘটেছে। সেগুলো এত দ্রুত ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও পুলিশ বাহিনীকে স্বাভাবিক কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে। পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকার পতনের পর থেকে দেশে থানাগুলোতে আক্রমণ হয়, অনেক পুলিশ সদস্যের প্রাণহানি ঘটেছে। এতে পুলিশ সদস্যরা ভীতসন্ত্রস্ত। সড়কে ট্রাফিক পুলিশ নেই। রাতে টহল পুলিশ নেই। এ পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। পুলিশ বাহিনী তাদের দায়িত্বে ফিরে আসবে এবং তাদের যার যে দায়িত্ব সেটা পালনে মনোযোগী হবে। এটাই প্রত্যাশিত। গত দুদিন ধরে নগরীর কিছু কিছু এলাকায় ডাকাত আতঙ্ক চলছে। অন্য সময়ে থানা পুলিশের সহযোগিতা চাইতে পারত মানুষ। এছাড়া দুর্বৃত্তরা তো এই সুযোগটা নিতে পারে। এই দুদিনও সাধারণ মানুষ অনুভব করেছে, এ সময়ে পুলিশ থাকলে তাদের এতটা আতঙ্কিত হতে হতো না। অন্যদিকে সড়কে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। তাদের দায়িত্ব পালন দেখে সবাই খুবই মুগ্ধ ও অভিভূত। এই কাজগুলো করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বাহিনী রয়েছে। সেই বাহিনীকেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা কমিয়ে আনা এবং ধীরে ধীরে তা দূর করা হবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের জঞ্জাল সাফ করতে বিশেষ করে দায়িত্বের বাইরে দলীয় আনুগত্যের বিষয়গুলো দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে প্রশাসনে স্থবিরতা তৈরি হবে। যেটা আগামী বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। সাম্প্রতিক অস্থিরতা গার্মেন্টস শিল্পকেও নাড়া দিয়েছে। সহিংসতার মুখে গার্মেন্টস কারখানাগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাংলাদেশে ৫৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৮৫ শতাংশই আসে এই খাতের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কারখানা থেকে। কোটা আন্দোলন শুরুর পর সরকার ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রেখে পোশাক শিল্প এবং সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা সচল করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষে নির্বাচন উপহার দেওয়া। বিগত সরকারের সময়ে যেটা ছিল উপেক্ষিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর এদেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার হারায়। ২০১৪ সালে দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি নির্বাচন বর্জনের পরও নগ্ন কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের হয়ে নির্বাচনে গেলেও আওয়ামী লীগ রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স বোঝাই করেছে। এতে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেননি বা যাননি। অর্থাৎ ভোট হয়েছে আওয়ামী লীগের ইচ্ছামতো। গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, তা রীতিমতো প্রহসন। এ যেন সার্কাস। ভোট যে একজন নাগরিকের অধিকার তা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এ কারণে ভোটের প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়েছে। ভোট যে নাগরিক অধিকার তা ভুলতে বসেছিল সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের ওপর জনগণের আস্থাহীনতা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছ নির্বাচন জনগণকে উপহার দেওয়ার জন্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। আশা করা যায় ড. ইউনূস বিশে^র দরবারে যে মর্যাদার পাত্র, তার স্বাক্ষর রাখবেন আগামী নির্বাচনে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক
zakpol74@gmail.com