নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর। আবার নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা করা। কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। দেশের প্রচলিত বিভিন্ন আইন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টকারীদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অনিষ্ট বা ক্ষতি করলে পেতে হবে কঠিন শাস্তি। আর দেশের অন্যান্য সম্পদের মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের ইমানি দায়িত্ব। যেহেতু এটা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, তাই এটা দেশের আপামর জনগণের হক। এই সম্পদ দেশের মানুষের কাছে আমানত। কোনোভাবেই তা নষ্ট ও অপচয় করার সুযোগ নেই। যে বা যারা এটা নষ্ট ও অপচয় করবে, এর সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত থাকবে, তারা প্রত্যেকেই পাপের ভাগীদার হবে। পবিত্র কোরআনে বারবার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে আমানত রক্ষা করার জন্য। সরকারি সম্পদ জনগণ ও দায়িত্বশীলদের কাছে আমানত। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশে তা বিচারকের কাছে পেশ কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৮)
প্রকৃত ইমানদার হওয়ার অন্যতম আলামত হলো আমানত রক্ষা করা। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর (তারাই প্রকৃত মুমিন) যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ৮) আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতকে তার মালিকের কাছে ফেরত দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৫৮)
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত এক হাদিসে উল্লেখ আছে, কেয়ামত দিবসে তিন ধরনের মামলা উঠবে। এক. ক্ষমার অযোগ্য মামলা। সেটি হলো শিরক করে তওবা ছাড়া মারা যাওয়া। দুই. আল্লাহর হক সংশ্লিষ্ট বিধান না মানা। সেগুলো আল্লাহ চাইলে মাফ করতে পারেন আবার চাইলে সাজাও দিতে পারেন। তিন. বান্দার হক নষ্ট করা। কারও হক নষ্ট করা, কাউকে গালি দেওয়া, কারও জমি আত্মসাৎ করা। এসব মামলার বিষয়ে মহান আল্লাহ বলবেন, এই মামলা আমার কাছে না। ওই বান্দা যদি তোমাকে ছাড় দেয় তো দিল, আর না দিলে আমি আল্লাহর কিছু করার নেই। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জানো (প্রকৃত) গরিব কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা তো মনে করি, আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই, সেই গরিব। তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের মধ্যে সেই সবচেয়ে বেশি গরিব হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে নামাজ, রোজা ও জাকাত আদায় করে আসবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোকেদেরও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও সম্পর্কে অপবাদ রটিয়েছে, কারও সম্পদ খেয়েছে, কাউকে হত্যা করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। এমন ব্যক্তিদের তার নেকিগুলো দিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর যখন তার নেকি শেষ হয়ে যাবে অথচ পাওনাদারের পাওনা তখনো বাকি, তখন পাওনাদারদের গুনাহ তার ওপর ঢেলে দেওয়া হবে, আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর প্রতিটি নাগরিকের এ আমানত রক্ষা করা উচিত। কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, তোমাদের আমানতগুলো প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৫৮)
রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারি) রাষ্ট্রীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পাহাড়, মাটি, বন, বালি, আরও যেকোনো সম্পদ যথাযথ ব্যবহার না করলে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হবে। অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (বনি ইসরাইল, আয়াত ২৭)
রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা কবিরা গুনাহ। এর ফলে কেয়ামতের দিন কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যারা আত্মসাৎ করে, তারা কেয়ামতের দিন আত্মসাৎকৃত সম্পদসহ উপস্থিত হবে। আর প্রত্যেকে তার উপার্জনের ফল ভোগ করবে।’ সুনানে আবু দাউদে এসেছে, হজরত যায়েদ ইবনে খালেদ জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, খায়বার যুদ্ধে জনৈক ব্যক্তি কোনো দ্রব্য আত্মসাৎ করে। পরে সে মারা গেলে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জানাজা পড়াননি। বরং তিনি বলেন, সে সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তার জিনিসপত্র তল্লাশি করে তাতে একটি রেশমি বস্ত্র পেয়েছিলাম।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, একবার হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে লুতবিয়াকে বায়তুল মালের অর্থ আদায়ের জন্য নিয়োগ করেন। তিনি ফিরে এসে আদায়কৃত অর্থগুলো দুভাগে ভাগ করে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ আর এগুলো আমার সম্পদ, যা মানুষ আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। তার কথা শুনে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব রেগে গেলেন। তিনি সাহাবাদের বললেন, তোমাদের কাউকে আমি সদকা আদায়ের জন্য পাঠালে, সে ফিরে এসে বলে, এগুলো রাষ্ট্রের আর এগুলো আমার সম্পদ, যা মানুষ আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। তার চিন্তা করা উচিত, যদি সে বাড়িতে বসে থাকত, তাহলে মানুষ তখন তাকে হাদিয়া দিত কিনা?
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর কসম! যারা রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করবে না, আমানতের খেয়ানত করবে, কেয়ামতের দিন তারা উট কাঁধে নিয়ে উঠবে। সে চিৎকার করে আমার কাছে সাহায্য চাইবে। কিন্তু সেদিন আমি তার কোনো সাহায্য করব না। কোরআন ও হাদিসের আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা মুমিনের ইমানি দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটি একটি বিশাল আমানত। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করে দেশের সার্বিক উন্নতি করার তওফিক দান করুন।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
drmazed96@gmail.com