বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতেই বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারকে উৎখাত করেছে ছাত্র-জনতা। দেশের প্রশাসনসহ অন্যান্য ব্যবস্থার মতো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেও জেঁকে বসেছিল স্বৈরাচারী শাসনের ভূত। রাজনৈতিক দল, সরকার আর রাষ্ট্র যেভাবে একাকার হয়ে গিয়েছিল শেখ হাসিনার আমলে, নাজমুল হাসান পাপন ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে বিসিবি, আবাহনী আর বেক্সিমকোতে কোনো পার্থক্য থাকেনি। মাঠে অন্যায় সুবিধা নিয়ে দেশের ক্রিকেটকেই তারা ঠেলে দিয়েছে ধ্বংসের মুখে। অথচ ক্ষমতার পালাবদলের পর এই সব মৌসুমি সংগঠক লাপাত্তা।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনী লিমিটেড, শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের অধুনালুপ্ত দল ঢাকা ডায়নামাইটসের পরিচালনায় সরাসরি সম্পৃক্ত বেক্সিমকো গ্রুপ। ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই সুবাদেই ক্রিকেট মাঠে অনেক অন্যায় সুবিধা আদায় করে নিত প্রতিষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত দলগুলো। গড়ে তুলেছিল বৈষম্যের দেয়াল, যেটা ভাঙার জন্য এখন সোচ্চার হয়েছেন অন্যান্য ক্লাবের প্রতিনিধিরা।
প্রাইম ব্যাংক দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক, যার চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী একজন ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ। নিজেও একসময় বিসিবির পরিচালক ছিলেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংকের একটা দল আছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের একটা দলেরও পৃষ্ঠপোষক ছিল প্রাইম ব্যাংক। দেশ রূপান্তরকে তানজিল জানিয়েছেন, নিজে বোর্ডে থেকে এবং লিখিত অভিযোগ দিয়েও অনিয়ম ঠেকাতে পারেননি, ‘আমরা সিসিডিএম, আম্পায়ার্স কমিটি ও বিসিবির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে। আমরা স্পোর্টস সায়েন্সের জন্য, প্রযুক্তি ব্যবহারের অংশ হিসেবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে অবাণিজ্যিক কারণে ভিডিও ধারণ করছিলাম। তখন খুব বাজেভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। আমি তখন বোর্ডে থাকায় বিসিবি প্রেসিডেন্টকেও জানিয়েছিলাম। বিসিএলের খেলার মান থেকে খেলোয়াড়দের প্রাপ্যতা, উইকেট এসব নিয়েও প্রশ্ন ছিল। আমরা দাবি জানিয়েছিলাম খেলার মান বাড়াতে হবে, টিভিতে প্রচার হতে হবে আর থার্ড আম্পায়ার থাকতে হবে। এ বিষয়গুলো ক্রিকেট বোর্ড কখনো আমলে নেয়নি, যে কারণে আমরা বিসিএলেও পৃষ্ঠপোষকতা করা বন্ধ করে দিই। বিসিবি আমাদের কাছ থেকে বিসিএলের প্রতি মৌসুমে স্পন্সরশিপ ফি হিসেবে ৫০ লাখ টাকা নিত, যদি আমি ভুল না করে থাকি। এই টাকার খরচ, ব্যবহারের ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম। আমরা জানতাম এই টাকাটা ক্রিকেটারদের স্যালারি হিসেবে যায়। কিন্তু পরে ক্রিকেটারদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারলাম এত কম স্যালারি পেয়ে থাকে, তখন প্রশ্ন এলো এই টাকা কোথায় যায়?’
আবাহনীকে সুবিধা দিতে প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ভেন্যুতে ম্যাচের সূচি নির্ধারণ, আম্পায়ারদের ওপর প্রভাব বিস্তার, ইচ্ছামতো লিগের নিয়ম পরিবর্তন, প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়দের জাতীয় দল বা হাই পারফরম্যান্স দলের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিয়ে বসিয়ে রাখাসহ অনেক অভিযোগই আছে বিসিবির বিরুদ্ধে। তানজিল বলেন, ‘ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের মান ধ্বংস হয়ে গেছে। ধরি একটা গ্রুপের নাম ‘এক্স’, তাদের হাতে যদি তিন-চারটা দল থাকে, তাহলে তাদের সঙ্গে তো আমরা কখনোই পারব না। আমাদের দাবি ছিল প্রকাশ্য প্লেয়ার্স ড্রাফটের, কিন্তু ওনারা কখনো রাজি হননি। আমরা যত ভালো দল বানাই না কেন, ফল পাব না। কারণ সূচি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই কিছু কিছু দল বাড়তি সুবিধা পেত। এ রকমও হয়েছে যে প্রাইম ব্যাংকের ক্রিকেটার যাদের এইচপি দলে থাকারও কথা নয়, তাদের এইচপি দলে নেওয়া হয়েছে যেন তারা প্রাইম ব্যাংকের হয়ে খেলতে না পারে। আমরা বহুবার এই বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’
একই রকম কথা শোনা গেল শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের কর্মকর্তার মুখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার লিগে বিদেশি প্লেয়ার কেন অ্যালাও করা হয়নি জানেন? কারণ ওরা (আবাহনী) চিরাগ জানি এবং পারভেজ রসুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তারা খেলতে রাজি হয়নি। এ জন্য লিগে বিদেশি ক্রিকেটারই বন্ধ করে দিল। আমাদের নুরুল হাসান সোহানকে টেস্ট দলে ঢুকিয়ে বসিয়ে রাখত, অনুশীলনেও ডাকত না। মৃত্যুঞ্জয়কে নিয়ে আয়ারল্যান্ড ঘুরিয়ে আনল লিগের মাঝপথে। আবাহনীর ১ পয়েন্ট দরকার হলে বৃষ্টি হলে খেলা বাতিল, আর আবাহনীর ৩ পয়েন্ট দরকার হলে সূচি পরিবর্তন করে ম্যাচ আবার হবে। এ ছাড়া আম্পায়ারিং নিয়ে বিতর্ক তো আছেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ভেন্যু। আবাহনীর সব ম্যাচ মিরপুরে। অন্যদিকে বিকেএসপিতে খেলতে যেতে হলে ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে জ্যাম ঠেলে প্লেয়ারদের যাওয়া লাগত। ফতুল্লার ড্রেসিংরুমে বসা যায় না। এসব ভেন্যুতে অন্য দলের ম্যাচ বেশি থাকত, আবাহনীর কম।’
এখন আর বিপিএলের নেই বেক্সিমকোর ঢাকা ডায়নামাইটস। বিপিএলের মান পড়ে যাওয়ার পেছনে বেক্সিমকোর একগুঁয়েমিকেই দায়ী করলেন রংপুর রাইডার্সের কর্মকর্তা শানিয়ান তানিম, ‘যেবার ঢাকা ডায়নামাইটস ছেড়ে সাকিব আল হাসান রংপুর রাইডার্সে এলেন, সেবার তারা বিপিএলটাই ঠিকঠাক হতে দিলেন না। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো তখন মাত্র জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল, বিপিএলের মান বাড়ছিল, তখনই ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দিয়ে বিপিএলটা শেষ করে দেওয়া হলো। বিপিএলের সব নিয়ম হতো ঢাকাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। ঢাকা কয়টা প্লেয়ার পেল তার ওপর নির্ভর করবে বিদেশি চারজন না পাঁচজন, নিবন্ধন কি উন্মুক্ত থাকবে না নির্দিষ্ট। কোনো নির্ধারিত টাকার অঙ্ক থাকে না ড্রাফটে, যে ড্রাফট হয় সেটা নার্সারির বাচ্চাও করতে পারবে।’
এভাবেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বেচ্ছাচারী আচরণের ঘুণপোকা কুরে কুরে খেয়েছে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটকে, যার প্রভাব দেখা গেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। শুধু ঢাকা লিগ বা বিপিএলের মতো শীর্ষ পর্যায়ের আসর নয়, দেশের ক্রিকেটের তৃণমূলেও ছড়িয়ে গেছে এই বিষবৃক্ষের শিকড়। ক্রিকেট সংগঠক তরিকুল ইসলাম টিটু বললেন, ‘ক্রিকেটের খুঁটি যেখানে, তৃতীয় বিভাগের বাছাই পর্ব থেকেই শুরু। কিছু ছেলে আসত দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ থেকে। আগে একশোর ওপর দল আসত বাছাই পর্ব খেলতে। এখন ওরা মাত্র দুইটা দল নিবন্ধন করায়, কাউকে খেলতে দেয় না। একটা ছেলে আমাকে ফোন করেছিল এই বলে যে ওকে নাকি ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। ওরা ক্রিকেটের নোংরামির চূড়ান্ত করেছে। অন্য সংগঠকদের মামলা দিয়ে দেশছাড়া করেছে। তারা কি ক্রিকেটের সংগঠক?’
আইসিসির বিধিনিষেধ থাকায় সরকার সরাসরি ক্রিকেট বোর্ডের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার রাখে না। তবে এই সব সংগঠকের বিশ্বাস, গোটা দেশ যেভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তেমনিভাবে ক্রীড়াঙ্গন থেকেও তার দোসররা উৎখাত হবে। প্রকৃত সংগঠকরাই প্রাধান্য পাবেন ক্রিকেট প্রশাসনে। তাহলেই সম্ভব হবে বৈষম্যের দেয়াল ভাঙা।