প্রিয় স্বামীর জন্য স্ত্রী, বাবার অপেক্ষায় সন্তানরা। আর প্রিয় দু'নেতার জন্য হাজারো কর্মীর অপেক্ষা। এভাবে বুক চেপে হিরু হুমায়ূন আসবেন বলে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্বজনরা। সত্যিই কি তিনি ফিরে আসছেন তবে! ঘুচবে কি তাদের আক্ষেপ, না কি তাদের আক্ষেপই থেকে যাবে।
বলছিলাম কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া লাকসাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু এবং তার সঙ্গে থাকা লাকসাম পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি হুমায়ূন কবীর পারভেজের কথা।
গুম হওয়ার এগারো বছর পরও স্বাসী ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা করছেন হিরুর স্ত্রী ফরিদা ইসলাম হাসি। কখন তার স্বামীর আসবে তার সেবা করবেন এভাবে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তিনি। আর আদরের জন্য অপেক্ষা করছেন দুই পরিবারে স্বজনদের।
২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে কুমিল্লার হরিশ্চর এলাকা থেকে নিখোঁজ রয়েছেন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু এবং তাঁর সঙ্গে থাকা লাকসাম পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি হুমায়ূন কবীর পারভেজ।
গত সোমবার (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর নিখোঁজ বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আ.লীগ সরকারের ‘আয়নাঘরে’ অনেক নেতা কর্মী বন্দি রয়েছেন। এ বন্ধীশালা থেকে অনেক ফিরে আসছে। তারই সূত্রে হিরু হুমায়ূন ফিরে আসছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে আলোচনা সমালোচনার ঝড়। কিন্তু তাদের পরিবার বলছে কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
তবে আয়নাঘরের খবরে নতুন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে খোঁজ খবর নিচ্ছেন দুই পরিবারের স্বজনরাও। হিরু ও পারভেজ বেঁচে আছেন কিনা মরে গেছেন এই সংবাদও দুই পরিবারের কারও কাছে নেই। অপেক্ষায় আছেন তারা ফিরে আসবেন।
মামলার অভিযোগ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে কুমিল্লার হরিশ্চর এলাকা থেকে র্যাব সদস্যরা ঢাকাগামী অ্যাম্বুলেন্স থেকে সাবেক এমপি হিরু, বিএনপির নেতা কবীর ও পৌর বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিনকে তুলে নিয়ে যায়। পরে র্যাব জসিমকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় অন্য একটি মাইক্রোবাসে তুলে দেয়। কিন্তু তাদের থানায় হাজির করেনি র্যাব। এরপর থেকে তাঁরা ‘নিখোঁজ’ রয়েছেন।
দু’জনকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় থানায় মামলা নেয়নি পুলিশ। পরে ২০১৪ সালের ১৮ মে হুমায়ূন কবীর পারভেজের বাবা রংগু মিয়া কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলায় র্যাব-১১-এর চাকরিচ্যুত প্রধান কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাহেদ রাজী, ডিএডি শাহজাহান আলী, এসআই সুলতান আহমেদ ও অসিত কুমারকে আসামি করা হয়। ওই বছরের ৩১ আগস্ট মামলার বাদী রংগু মিয়া মারা যান। এতে ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর পারভেজের ছোট ভাই গোলাম ফারুককে এ মামলার বাদী করা হয়। ২০১৫ সালে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। এতে র্যাব কর্তৃক দু’জনকে ‘অপহরণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি’ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে দুই ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ‘আত্মগোপনে’ থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে মামলার আইনজীবী বদিউল আলম সুজন বলেন, “পুলিশের তদন্তের পর সিআইডি সাড়ে ৫ বছরে অন্তত ৬৩ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে একটি মনগড়া ও মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়েছে। পরে বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে আদালত মামলা পিবিআইতে স্থানান্তর করে। মামলা এখন তদন্ত করছেন পুলিশের লাকসাম সার্কেলের একজন এএসপি। আশা করি, স্বজনরা বেঁচে থাকলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম হিরুর একমাত্র ছেলে রাফসানুল ইসলাম বলেন, “বাবার খোঁজ চেয়ে অনেকের দ্বারস্থ হয়েছি। লাকসাম থানায় মামলা নেয়নি। পরে কোনো উপায় না পেয়ে বাবা হারিয়ে গেছে এই মর্মে একটি জিডি করি। সেখান থেকে আমরা যাই র্যাব-১১ এর নারায়ণগঞ্জ অফিসে। র্যাব সেদিন অভিযান চালালেও আমার বাবাকে আটক করেনি বলে জানানো হয়। সেই থেকে যেখানেই বাবার খোঁজ আছে শুনেছি, সেখানেই ছুটে গেছি। এখনও বাবাকে খুঁজছি। আমরা ডিজিএফআইর সঙ্গে দেখা করেছি, তারা প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য-প্রমাণ চেয়েছে, আমরা সব দিয়েছি। আশা করি বাবাকে ফিরে পাব।”
হিরুর স্ত্রী ফরিদা ইসলাম হাসি বলেন, “সন্তানরা বাবার জন্য সারাক্ষণ কাঁদছে। সরকার পরিবর্তনের পর আয়নাঘর থেকে অনেকেই ফিরে আসছে। তার স্বামীও ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। আশা করি নতুন সরকার এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। নিখোঁজ হুমায়ূন কবীর পারভেজের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার বলেন, আমার স্বামীর কী অপরাধ ছিল? বিএনপি করা কী অপরাধ? আমরা প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পেতে চাই।”
পারভেজের ছেলে শাহরিয়ার কবির রাতুল বলেন, “আশা করি নতুন সরকারের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক খবর পাব।”