আঙ্গে-জ্যাখঁ গ্যাব্রিয়েল, নামজাদা ফরাসি স্থপতি। রাজা চতুর্দশ লুইসের সময়কার মানুষ। ৮৩ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন ১৭৮২ সালে, যার শতবর্ষ পরে ১৮৯৬ সালে শুরু হয় আজকের এই আধুনিক অলিম্পিক। স্থপতি গ্যাব্রিয়েলের প্রসঙ্গ ওঠার কারণ, এবারের অলিম্পিকের আয়োজক শহর প্যারিস তাই। অলিম্পিকের মুগ্ধতা ছড়ানো যে প্যারিস শহরটিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটির আজকের এই রূপের পেছনের কারিগর যে স্থপতি গ্যাব্রিয়েল।
গ্যাব্রিয়েলের সন্তান, এমনকি নাতিরাও পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে স্থাপত্যশিল্পেই নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। করবেন নাই-বা কেন! প্যারিসের যেসব স্থাপত্য আমাদের দৃষ্টিকে বিমোহিত করে তোলে, সেগুলো যে গ্যাব্রিয়েলের হাতেই গড়ে ওঠা। প্যালেস অব ভার্সেইয়ের নজরকাড়া বাগান কিংবা ঐতিহাসিক লে’কোল মিলিতেইর তার নকশা করা। প্যারিসের ঠিক হৃৎপিণ্ডে ১৯ একর জমির ওপর অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় আরবান সেন্টার প্লেস দে লা কনকর্ডও বানিয়ে গেছেন স্থপতি গ্যাব্রিয়েল।
প্লেস দে লা কনকর্ড আরও একটি কারণে এই লেখার সঙ্গে ভীষণ সংগতিপূর্ণ। এই জায়গায় গ্যাব্রিয়েল চেয়েছিলেন রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করতে। সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তবে ঠিক সেই জায়গাতেই এবার দেখা যাচ্ছে রেইলসের ওপর দিয়ে স্কেটবোর্ডারদের গ্লাইড করতে। লম্বা লাফ দিয়ে বল জালে ফেলছেন লেব্রন জেমসের মতো বাস্কেটবল কিংবদন্তি। বাতাস ফুঁড়ে যেন উড়ে যাচ্ছেন বিএমএক্স সাইক্লিস্টরা। এক পাশে প্যারিসের নান্দনিক স্থাপনা লুক্সর ওবেলিস্ক, তো অন্য পাশে বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার। এরই মাঝে নির্মিত হয়েছে প্যারিস অলিম্পিকের চারটি অস্থায়ী ভেন্যু। অলিম্পিক কী জিনিস তা জানতে পারার ১০০ বছর আগেই ওপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন গ্যাব্রিয়েল। কিন্তু দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ এবং তার হাতে গড়ে ওঠা প্যারিস কীভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে, তা যদি তিনি আজ দেখতে পেতেন, নিশ্চয় গর্বিত হতেন।
শুধুই কি গ্যাব্রিয়েল! তারই মতো স্থপতি জুলস-হারদুই মানসার্ট, চার্লস গার্নিয়ার, জ্য শেলগ্রিন এবং গুস্তাভ আইফেলদের হাতে গড়ে ওঠা প্যারিসের এক একটি নান্দনিক স্থাপনা এবারের অলিম্পিককে ঠাঁই দিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। অলিম্পিকের ১২৮ বছরে ইতিহাসে আগে কখনোই আয়োজক শহরকে ঘিরে এমন তুলকালাম আয়োজনের সাহস দেখাতে পারেনি কোনো রাষ্ট্র। যার প্রথম দৃষ্টান্ত দেখা গিয়েছিল এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ইতিহাস কিংবা প্রথা ভেঙে বদ্ধ স্টেডিয়াম ছেড়ে শহরজুড়ে হয়েছিল বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী। স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে নয়, প্যারিসের বিখ্যাত সেন নদীর ৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে হয় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর প্যারেড। শহরটির এমন কোনো স্থাপনা নেই, যেটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়নি ওই আয়োজনে। কেবল উদ্বোধনী আয়োজনই নয়, ইভেন্টগুলো আয়োজনের ক্ষেত্রেও পুরো প্যারিসকে ক্যানভাসের মতো ব্যবহার করা হয়েছে এবারের অলিম্পিক আঁকার ক্ষেত্রে।
বছরের পর বছর ধরে অলিম্পিক আয়োজন করার নামে জনগণের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ বিনিয়োগ করে নতুন নতুন ক্রীড়া স্থাপনা তৈরি করে এসেছে আয়োজক শহরগুলো। যেগুলো পরের সময়গুলোতে হয় আর কোনো কাজে আসেনি কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। প্যারিস ঠিক চিন্তার এই জায়গাতেই এনেছে বদল। শহরের উপকূলে সাদা হস্তীর মতো কোনো স্থাপনা নির্মাণে কোনো পয়সা খরচ না করে বরং প্রসিদ্ধ স্থাপনাগুলোকেই আয়োজনের আলো ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছে কর্র্তৃপক্ষ। যেটি একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে আয়োজনের জৌলুশ।
এর চেয়ে মনোমুগ্ধকর বিষয় আর কী হতে পারে! ভালোবাসার শহর প্যারিসকে ব্যবহারের দিক থেকে এবারের অলিম্পিক যে মানদণ্ড স্থাপন করেছে, তা হয়তো পরে যেকোনো আয়োজক দেশের ছাপিয়ে যাওয়া দুরূহ হয়ে উঠবে। অলিম্পিক শুরুর আগেই নিরাপত্তা, পানিদূষণ কিংবা উদ্বোধনী আয়োজনের কিছু অনুষঙ্গ নিয়ে বিতর্কিত হতে হয়েছিল অলিম্পিককে। সময় গড়িয়ে শেষের ক্ষণে দাঁড়িয়ে সেগুলোকে ছাপিয়ে গিয়ে বরং মুগ্ধতাই ছড়িয়েছে প্যারিস অলিম্পিক। সেই সঙ্গে এই মুগ্ধতা ছড়ানোর এই মানদণ্ডটিই ভবিষ্যৎ আয়োজক শহরগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রেখে দিয়ে যাচ্ছে প্যারিস।