ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পরিচয়হীন ২০ মরদেহ পড়ে আছে। এ মরদেহগুলো কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতার সময় কোনোটি নিহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে বা কোনোটি আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মরদেহগুলো হাসপাতাল মর্গে রাখা হলেও তাদের খোঁজ নিতে এখনো কেউ আসেনি।
এদিকে মর্গে লাশ রাখার ফ্রিজ ভালো না থাকার কারণে এগুলো সংরক্ষণ করে রাখাও যাচ্ছে না। মর্গে পড়ে থাকতে থাকতে ইতিমধ্যে লাশগুলো বিকৃত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশ না থাকায় সুরতহাল প্রতিবেদনও আটকে আছে। ময়নাতদন্ত করতে গেলে পুলিশ প্রতিবেদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরকার পতনের পর থেকে বিভিন্ন থানায় এখনো পুলিশ পুরোদমে কাজ শুরু করেনি, ফলে সুরতহাল প্রতিবেদনও করা যাচ্ছে না।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী, ব্যবসায়ী, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মৃত্যু হয়। পরে তাদের পরিবার-পরিজন ও স্বজনরা মরদেহগুলো মর্গ থেকে নিয়ে যান। তবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ও মরদেহের দাবিদার কাউকে না পাওয়ার কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ১৭টি এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তিনটি মরদেহ পড়ে আছে।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সরকারের পতনের পরের তিন দিন হাসপাতালে গুরুতর আহত অনেককে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। আবার কয়েকটি মরদেহ মৃত্যুর দুই-তিন দিন পরও রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে আনা হয়, এসব পড়ে থাকা মরদেহের মধ্যে পুড়ে যাওয়া বডিও রয়েছে। এসব মরদেহ এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
সূত্র জানায়, হাসপাতাল ও কলেজের মর্গে এখন যে মরদেহ পড়ে আছে, সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নেই। তবে তিনজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে যারা রয়েছেন, তারা প্রাপ্তবয়স্ক।
ঢামেক হাসপাতাল মর্গের ইনচার্জ রামু চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, মর্গে মরদেহগুলো চার-পাঁচ দিন ধরে পড়ে রয়েছে। লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে রাখা হয়েছে।
শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মরদেহগুলোর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা করছি পরিচয় শনাক্ত করতে। সোমবার (আজ) সিআইডি থেকে ফরেনসিক টিম যাবে। এরপরও যদি পরিচয় শনাক্ত করা না যায়, তাহলে মরদেহগুলো দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দেওয়া হতে পারে।’
ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৭টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি, তবে শেষ পর্যন্ত যদি শনাক্ত করা না যায় কিংবা মরদেহ কেউ দাবি না করে তবে ডিএনএ স্যাম্পল রেখে মরদেহগুলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে দিয়ে দেওয়া হবে। কেউ যদি মরদেহ দাবি করতে আসেন তাহলে যেন ডিএনএ টেস্ট করে মেলানো যায়।’
ঢাকায় যখন ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে তখন রোগীদের ভিড় জমেছিল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। এখানে কমপক্ষে ৬৫০ জন রোগী আহত হয়ে চিকিৎসা নেন, যার মধ্যে ২২০ জন গুরুতর আহত ছিলেন। গতকাল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কোটা আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মর্গে রাখা হয়েছে, বাকিগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে এখনো অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. শফিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে লাশ রাখার ফ্রিজারগুলোতে কিছুটা ত্রুটি রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিজিং করে রাখা সম্ভব নয়। হাসপাতালের মর্গে এখনো তিনটি মরদেহ রয়েছে আমরা তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারিনি। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের মরদেহ থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ছাত্র আন্দোলনের নেতাদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে, তারা পরিচয় শনাক্ত করতে পারে কি না দেখছি।’