রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গনÑ সর্বত্রই পদত্যাগের হিড়িক। কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, কেউ চাপের মুখে। অনড় আছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের রক্ষাকবচে মন্ত্রিত্ব হারিয়ে আত্মগোপনে চলে গেলেও এখনো বিসিবির মসনদে তিনি আছেন, অন্তত কাগজে-কলমে। নিষিদ্ধগোষ্ঠীর নেতার মতো গোপন আস্তানা থেকে নির্দেশও পাঠাচ্ছেন নিশ্চয়ই, আর সেসব পালনের জন্য আজ্ঞাবহরা তো এখনো কর্মরত। প্রায় দেড় দশকের স্বেচ্ছাচার, গোষ্ঠীতন্ত্র আর স্বজনপ্রীতিতে ভুক্তভোগী হয়েছেন অনেক ক্রিকেট সংগঠক। তাদেরই একটি সংগঠন ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া উন্নয়ন পরিষদ’-এর আয়োজনে মঙ্গলবার বিসিবি কার্যালয়ের সামনে হয়েছে মানববন্ধন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশ। যে সমাবেশ ক্রিকেট সংগঠকদের পাশাপাশি দেখা গেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের। বিক্ষুব্ধদের মাঝে দেখা গেছে এমন কিছু মানুষকেও, যারা বিগত সময়ে গাছেরটা খেয়ে এখন তলারটাও কুড়াতে এসেছেন।
শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বগ্রহণের আগেই একদল লোক বিসিবিতে এসে পেশিশক্তির মহড়া দেখানো শুরু করেন। ৬ আগস্ট ‘ক্রিকেট সংগঠকবৃন্দ’ হিসেবে বিসিবি পরিচালকদের পদত্যাগ চেয়ে যারা এসেছিলেন শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অবস্থিত বিসিবি কার্যালয়ে, মঙ্গলবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। বিসিবির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু ও কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল এক সপ্তাহ আগেও একই দাবিতে এসেছিলেন, কাল তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক আমিনুল হক। ক্রীড়াবিদ পরিচয়ের বাইরে যার আরেকটি পরিচয় হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব। আমিনুলের আসার কারণে আশপাশের এলাকা থেকে বিএনপির সমর্থকদের বেশ কিছু মিছিল এসে যোগ দেয় মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ সমাবেশে। বিসিবি কার্যালয়ের প্রবেশপথের সামনে রাস্তায় হাজারখানেক মানুষের মানববন্ধনে নাজমুল হাসান পাপনসহ বিসিবির বিভিন্ন পরিচালকের ছবির প্ল্যাকার্ড বানিয়ে তাতে ক্রস চিহ্ন এঁকে পদত্যাগ চেয়েছেন বিক্ষুব্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা। এ সময় একদল সেনাসদস্যের কড়া পাহারায় ছিল বিসিবি কার্যালয়ের প্রবেশপথ।
বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে আমিনুল, দেবব্রত পাল, রফিকুল ইসলাম বাবুসহ কয়েকজন বিসিবি কার্যালয়ে ঢুকে বোর্ড পরিচালকদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। তবে হিসাব বিভাগের ব্যবস্থাপক এবং কয়েকজন কর্মী ছাড়া দায়িত্বশীল কাউকেই পাননি তারা। বের হয়ে এসে সাংবাদিকদের আমিনুল বলেন, ‘আমি আপনাদের ওয়াদা করছি, ভবিষ্যতে ক্রিকেট বোর্ড ফুটবল ফেডারেশন কোথাও কোনো রাজনীতিকরণ করা হবে না।’ তিনি নিজেও যেহেতু রাজনীতির মানুষ, ক্রীড়াঙ্গনে তাহলে কি তিনি বা তার মতো কেউ থাকবে নাÑ এমন প্রশ্নে অবশ্য বলেছেন, তিনি এক দলের রাজনীতির মানুষদের দেখতে চান না! বিক্ষুব্ধদের ভিড়ে বিসিবির গঠনতন্ত্র হাতে কয়েকজন ক্লাব কর্মকর্তাকেও দেখা গেছে, যারা হয়তো আলোচনার প্রস্তুতির জন্য সেটা পড়ে দেখছেন!
আবাহনীসহ বিশেষ কিছু ক্লাবকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায় অন্য অনেক ক্লাবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক একাডেমির তরুণরা সুযোগ পায়নি স্বজনপ্রীতির কারণে; এসব যেমন সত্য, তেমনি সত্য হচ্ছে বিক্ষুব্ধদের ভেতর অনেকেই আছেন যারা বিসিবির পরিচালকদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন দীর্ঘদিন। তাদেরই একজন মুন্না মিরাজ। ছিলেন বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ইসমাঈল হায়দার মল্লিকের ডানহাত। আবাহনীর ম্যাচে সমর্থকদের ভেন্যুতে নিয়ে যাওয়ার কাজটা তদারকি করতেন। এ ছাড়া বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীদের দলনেতা হিসেবেও বিভিন্ন সিরিজে ওয়াকিটকি হাতে তাকে দেখা যেত প্রবেশপথে। সেই মুন্না মিরাজও ভোল পাল্টেছেন। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল। কোয়াবের সভাপতি নাঈমুর রহমান দুর্জয় দুটো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ থেকে সাংসদ হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক বর্তমানে বিসিবির পরিচালক এবং হাই পারফরম্যান্স কমিটির প্রধান। তার নেতৃত্বে কোয়াব পরিণত হয়েছে বিসিবির পকেট সংগঠনে। এমনকি কোয়াবের সবশেষ বার্ষিক সাধারণ সভাও হয়েছে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামেই, যেখানে এসেছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান।
সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান দেশে নেই, এমনটাই শোনা যাচ্ছে। পলাতক আরও অনেকেই। তবে বিসিবির অনেক পরিচালকই দেশে আছেন, ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে দেখাও করেছেন। ক্রীড়া উপদেষ্টা তাদের আইসিসির আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই সংকটের সমাধান খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব প্রক্রিয়ার মাঝে বিসিবি কার্যালয় ঘিরে ঘন ঘন বিক্ষোভ সমাবেশ এবং পেশিশক্তির মহড়া আশঙ্কায় ফেলে দিতে পারে বাংলাদেশের মাটিতে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপ আয়োজন। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য সরকার তাদের দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করছে। বিসিবি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ আর পেছনে অটোমেটিক রাইফেল হাতে দাঁড়ানো একদল সেনাসদস্য, এই ছবিগুলো নিঃসন্দেহে সংকটের মাত্রাকে আরও ঘনীভূত করবে।