তরুণদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সাদৃশ্য তৈরি করতে হবে

কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। বরাবরের মতো এবারের ঘটনায় ভারতের তৎপরতা এবং চীন-রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা নিয়েও অনেক রকম কথা হচ্ছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত বরাবরই সংগত কারণে আলোচনায় চলে আসে। এবার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করার বিষয়টি নিয়েও নানা স্তরে জটিলতা তৈরি করছে।

এম হুমায়ুন কবির : ভারতের প্রতিক্রিয়াকে আমি দুই স্তরে দেখছি। একটা হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে আরেকটা হচ্ছে সরকারের বাইরে, পার্টিকুলারলি ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এই পর্যায়ে। সরকারি পর্যায়ে তাদের একটা কনসার্ন আছে আমরা জানি। গত ৬ তারিখে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের আপার হাউজের রাজ্যসভায় সব দলের সদস্যদের বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্রিফ করেছেন। সেই ব্রিফিংয়ে যে কাগজটা আমরা পেয়েছি, তাতে দেখা যায়  সেখানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এসব কথা বলা হয়েছে। তবে তিনি দুটো জিনিস সেখানে স্বীকার করেছেন। আমাদের সামরিক বাহিনী, রাজনৈতিক দল, আন্দোলনরত ছাত্রসমাজ সবাই মিলেই সহিংসতা যাতে না বাড়ে সেই উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সংখ্যালঘুরা যেন নিরাপদে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে পারে বিভিন্ন সংস্থাও সে নিয়ে উদ্যোগী। আরেকটা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে। আমার ধারণা, তখন তো সরকার ছিল না, সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ তারা রক্ষা করছিল এবং আশা করি এ বিষয়টি ইতিবাচক এবং সক্রিয় হবে। কিন্তু ওই ব্রিফিংয়ে যেটা ছিল না, সেটা হচ্ছে সরকার পতনের  প্রেক্ষাপটের বর্ণনায় এখানে যে বড় ধরনের কিলিং হয়েছে, বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জেনেছি প্রায় ৭০০ মানুষের মৃত্যু হলো, তারমধ্যে পুলিশও ছিল এত বড় হত্যাকা-ের প্রেক্ষাপটেই যে আন্দোলনটা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে সংখ্যালঘু উপাদানের সঙ্গে যে রাজনৈতিক উপাদানও যুক্ত ছিল, এই বিষয়গুলো কিন্তু তিনি খুব একটা খোলাসা করেননি। কাজেই একটা ধারণা এ-রকমভাবে জন্মানোর সুযোগ ছিল যে, বাংলাদেশে কেবল সংখ্যালঘুরা নিষ্পেষিত হচ্ছে, অনিরাপদ। ভারতের সরকারি তরফ থেকে ৬ তারিখের পরও এ-রকম বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আজও (১৫ আগস্ট) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও হিন্দু সম্প্রদায়ের কথাই কেবল বলেছেন।

এম হুমায়ুন কবির : হ্যাঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি আজ এই কনসার্নটাই কেবল এক্সপ্রেস করেছেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে এটা তো কেবল ভারতের কনসার্ন না আমাদেরও কনসার্ন। আমরাও তো চাই না এখানে সংখ্যালঘু কি সংখ্যাগুরু কেউই কোনো ধরনের আক্রমণের মধ্যে পড়ুক এবং এখানকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ব্যাহত হোক। লক্ষ করেছি প্রথম দিন থেকেই কিন্তু আন্দোলনরত ছাত্ররা, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দলের নেতারা সবাই মিলে শুধুমাত্র মুখে যে এসব সহিংসতা বন্ধের কথা বলেছেন তাই-ই নয়, তারা সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন মন্দির, মাজার রক্ষার জন্য উদ্যোগী হয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। মিডিয়াতেই এসেছে যে মাদ্রাসার ছাত্ররা মন্দির পাহারা দিচ্ছে। আমি মনে করি এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যে এসব উদ্যোগ আমাদের আছে সেটা জোরালো বলা দরকার এবং বাইরের পৃথিবীরও সেটা জানা দরকার। যেই ঘটনাগুলো ঘটেছে সেই ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। আক্রান্তদের কেউ কেউ হয়তো মাইনরিটি কমিউনিটির লোক, কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে, জানা যাচ্ছে যে তারা আসলে আওয়ামী লীগার ছিল। কিন্তু এটাও থামাতে হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট থেকে  সেটাকে দেখতে হবে, যদিও কোনো সহিংসতাই কাম্য নয়। কেউই সেটা চায় না, আমরাও এমন চাই না।

দেশ রূপান্তর : সরকারি পর্যায়ে ভারতের এই ভূমিকার কারণ কী বলে মনে করেন? আপনার পরামর্শ কী?

এম হুমায়ুন কবির : এই জায়গাতে আমার ধারণা যে ভারতীয় সরকারের কিছু বিষয় উপলব্ধি করা দরকার। গতকাল (বুধবার) ভারতের হাই কমিশনার আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে  দেখা করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাবে। এবং আমার ধারণা সরকারি পর্যায়ে এটা নিয়ে এখন একটা উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, হ্যাঁ, বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের পটপরিবর্তন এসেছে। এখানে আরও একটা কথা যোগ করতে চাই যে, ভারতের সরকারি পর্যায়ে মনে করছে বাংলাদেশের এই গণআন্দোলনটা তাদের জন্য একটা লস, তাদের সেন্স অব লস; তাদের ধারণা জন্মেছে যে, তারা বিরাট কিছু হারিয়ে ফেলেছে। কারণ আগের সরকারের সঙ্গে, নেতাদের সঙ্গে তাদের যে যোগাযোগ, সহযোগিতা বা বন্ধুত্ব ছিল এবং নীতিগতভাবে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভারত পেয়েছে, সেটা কৌশলগত বা আর্থিক যা-ই বলেন, সেখানে এখন তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, এত বড় একটা আন্দোলন হবে, গণ-অভ্যুত্থান হবে এটা তারা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। পারেনি বলেই তাদের সরকারি পর্যায়েও এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে যে, বাংলাদেশে যে কী হয়ে গেল! তারা বারবার বলার চেষ্টা করছে যে এটা একটা সামরিক অভ্যুত্থান। কিন্তু এখানে আন্দোলনটা তো ছাত্ররাই লিড করেছে। সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা নেয়নি, তারা পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : রাহুলও তো আইএসআই আছে কি না খোঁজ নিতে বলেছেন।

এম হুমায়ুন কবির : হ্যাঁ, এখানে আইএসএ আছে কি না, চায়না আছে কি না নানান ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে তারা আছে। রাহুল, অখিলেশ তারাও এসব বলছে। কাজেই ভারতের সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে একটা বিভ্রান্তি আছে। তারা আমাদের এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, যেটা অভ্যন্তরীণভাবে ছাত্রদের নেতৃত্বে হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ছাত্ররা যে ড্রাইভিং সিটে আছে এই জিনিসটা তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। এত বড় আন্দোলন যে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছাড়া হতে পারে সেটা তারা বিশ্বাস করছে না।

দেশ রূপান্তর : সরকারের বাইরের যে প্রতিক্রিয়ার কথা বললেন...

এম হুমায়ুন কবির : মিডিয়া এবং সামাজিকমাধ্যম পর্যায়ে যেটা হয়েছে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ফেইক, মিস-ইনফরমেশন, ডিস-ইনফরমেশন দিয়ে বিশাল ক্যাম্পেইন হয়েছে। তাতে করে ভারতের নাগরিক সমাজ পর্যায়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কেবল তাই নয়, ভারতের এই মিডিয়াগুলো বাইরের পৃথিবীতেও বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে অবদান রেখেছে বলে আমার ধারণা। কাজেই এই জায়গাটায় আমার বক্তব্য হচ্ছে, এই মিস-ইনফরমেশন, ডিস-ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে সরকারি পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের কথা তুলে ধরতে হবে। ভারতের এই সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এবং সেখানকার নাগরিক সমাজের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা সেভাবে হয়নি বা আমাদের দিক থেকে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বাস্তব অবস্থাটা তুলে ধরার উদ্যোগ প্রয়োজন, সেটা আমরা নিতে পারিনি। বড় সমস্যা হচ্ছে, গ্লোবালি একটা ধারণা এবং আলোচনার জন্ম হয়েছে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে এবং বৈশি^ক পর্যায়ে এটার সোর্স হচ্ছে ইন্ডিয়ান মিডিয়া। কাজেই এটা আমাদের অনেক ড্যামেজ করছে। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন ধরেন, লিটন দাসের বাড়ি পুড়েনি কিন্তু ওরা বলছে লিটন দাসের বাড়ি পুড়েছে। এখানে ২ মিনিট বা ৫ মিনিটের ভিডিও করতে পারি যে, তুমি বলো যে তোমার বাড়ি পুড়ে যায়নি এবং সেটা অনলাইনে ছেড়ে দিতে পারি। ফ্যাক্ট বেইসড আলোচনা করতে পারি, যাতে পাল্টা তথ্যটা সেখানকার নাগরিকরা পান। আমাদের দিক থেকে এসব উদ্যোগ জোরালোভাবে এখনো দেখছি না।

দেশ রূপান্তর : অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের নানাবিধ সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? দুদিন আগে আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যে বললেন, ভারতে বসে শেখ হাসিনা বিবৃতি দিলে সম্পর্কের ক্ষতি হবে। আপনার মন্তব্য কী?

এম হুমায়ুন কবির : আমি মনে করি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ঠিক কথাই বলেছেন। ধরেন শেখ হাসিনা ওখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, ঠিক আছে, ভারত এ-রকম বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয়।

দেশ রূপান্তর : আমরা তো দেখেছি অনেককেই দেয়নি। যেমন রাজপাকসে, আশরাফ ঘানিকে  দেয়নি...

এম হুমায়ুন কবির : এখানে মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনা আর আশরাফ ঘানি তো এক জিনিস না। শেখ হাসিনা হচ্ছেন তাদের ঘনিষ্ঠ। শুধু ঘনিষ্ঠ না, একদম মহাঘনিষ্ঠ ছিলেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেসব জিনিস আমরা দেখেছি এই আন্দোলন-উত্তর সময়ে এবং তার চলে যাওয়ার শেষের দিকের বিষয় উল্লেখ নাই বা করলাম, মানে তাদের অনেক গভীর সম্পর্ক ছিল এবং সে প্রেক্ষাপটে তারা হয়তো বিবেচনা করেছে। কিন্তু এই জায়গাটাই আমাদের জন্য অস্বস্তির কারণ। তিনি ওখানে থেকে যদি রাজনীতি করেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়গুলোয় মন্তব্য করতে থাকেন তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই এই সরকারের জন্য অস্বস্তি  তৈরি হয় এবং সেই কথাটাই আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলার চেষ্টা করেছেন। এখন ধরেন ভারতে থেকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিকূলে বা বিপক্ষে যদি বক্তব্য আসে, তাহলে তো সেখানে এ বিষয়ে ভারতের সংশ্লিষ্টতা চলে আসে। আমার মনে হয় এটার কারণে দুদেশের সম্পর্কের মধ্যে কাঁটা তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করব ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক থাকবে। ভারত-বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ, আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু বহুমাত্রিকভাবে আমরা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও চাহিদা মনে রেখে ভারতকে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে এখানে সম্পর্কটা কিন্তু ব্যক্তিপ্রধান নয়। এখানে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যদি সামগ্রিকভাবে জনগণেলর প্রতি মনোযোগ না দেওয়া হয় তাহলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে ছায়া দেখা দেবে। ভারতে রয়েছে একটা ম্যাচিউর  ডেমোক্রেসি, নেতারাও ম্যাচিউর। তারা এই বিষয়টি উপলব্ধি করে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশা মাথায় রেখে আগামীর সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার আশা। তারা যদি সেই বাস্তবতা উপলব্ধি না করে তাহলে সম্পর্ক জটিলতায় যাবে আর যদি উপলব্ধি করে তাহলে স্বাভাবিক চলবে।

দেশ রূপান্তর : বিগত সরকারের সময়ে চীন-রাশিয়ার সঙ্গে একরকম সম্পর্কের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। এখানে চীন-রাশিয়ার ব্যাপক বিনিয়োগও আছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামনের দিনগুলোতে এই সম্পর্ক কেমন থাকবে মনে করেন?

এম হুমায়ুন কবির : চীন বলেছে এটা বাংলাদেশের একেবারেই অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং তারা এটার সঙ্গে সম্পৃক্ত না। চীনের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্পর্ক আমি দেখছি না। চীনের যে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক সক্ষমতা আছে সহায়তার, তাতে বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের জন্যই তাকে প্রয়োজন। এবং যেকোনো সরকারের এ বিষয়টি মাথায় রেখে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, আগেও রেখেছে এখনও রাখবে, ভবিষ্যতেও রাখবে। একইভাবে রাশিয়ার সঙ্গেও। রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের মূল সম্পর্ক হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প। এখন  যেটা হতে পারে আজ (বৃহস্পতিবার) রাশিয়ান অ্যাম্বাসাডর একটা ইঙ্গিত করেছেন যে এটা নিয়ে একটা ডিল হতে পারে। এটা ছাড়া বড় কিছু হবে না। কারণ হচ্ছে রাশিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি আগের সরকার করেছে, আমরা জানি এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে কিন্তু কথা থাকলেও আপনি যখন চুক্তি করেছেন তখন দেশ হিসেবেই আপনাকে দায়িত্ব নিতে হবে এবং তার থেকে  যে পয়সা বা ঋণ নিয়েছেন সেটা পরিশোধ আপনাকে করতেই হবে। কাজেই এদিক থেকে আমাদের সম্পর্কের খুব একটা হেরফের হওয়ার কারণ আমি দেখছি না।

দেশ রূপান্তর : বিদায়ী হাসিনা সরকারের প্রতি গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার ইত্যাদি প্রশ্নে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব নেতিবাচক ছিল। সাধারণ ধারণা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্ব ইতিবাচক। ইতিমধ্যে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউকে থেকে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। এমন আলাপও আছে যে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানটি মার্কিন ব্লু-প্রিন্ট, আরও নানান কন্সপিরেসি তত্ত্বও আলোচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?

এম হুমায়ুন কবির : এখানে যেটা হয়, আমরা আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কাজকে জাস্টিফাই করার জন্য এসব ষড়যন্ত্রের তথ্য সাধারণভাবে আবিষ্কার করি। সেটা ভারতের স্কলার রাজা মোহন একটা লেখায় গত বুধবার বলেছেন যে, আমরা যখনই কোনো ধরনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাজ করতে থাকি এবং জনস্বার্থমূলক পথ থেকে সরে গিয়ে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি তখনই আমরা এ ধরনের ষড়যন্ত্রের দাবি আবিষ্কার করি। বাংলাদেশের  ক্ষেত্রে গত ১৫ বছরে যে এককেন্দ্রিক বা অথোরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এবং নাগরিক অধিকার থেকে শুরু করে মিডিয়ার স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা, টাকা পাচারের কাজগুলো হয়েছে, এটা তো আমরা সবাই জানি। কাজেই এই কাজগুলোকে পাশ্চাত্য বিশ্ব অনুমোদন করে না। কারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়  সেখানে মানুষের মতের ভিত্তিতে সরকার হয়। সেখানে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে এবং যেখানে মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়।  সেক্ষেত্রে পশ্চিমা জগৎ এ বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার থেকেছে। পাশ্চাত্য জগৎ আমাদের আগের সরকারের এসব কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন দেয়নি। এখন সেটাকে আমরা ষড়যন্ত্র হিসেবে ছড়ানোর চেষ্টা করছি, কারণ তাহলে আমার দায়িত্বটা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া সহজ। এখানে গণ-অভ্যুত্থানের বাস্তবতা যেটা, এখানে আন্দোলনে কোনো বাইরের শক্তি আমি  দেখিনি। আপনি দেখেন ১৫ তারিখ পর্যন্ত এটা ঢাকা ইউনিভার্সিটিকেন্দ্রিক অহিংস কোটা আন্দোলন ছিল। যখনই ১৬ তারিখে আবু সাঈদসহ ৬ জনের মৃত্যু ঘটল, তখনই কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছাপিয়ে সারা বাংলাদেশের ছাত্রদের মধ্যে আন্দোলন সংক্রমিত হয়ে গেল। সারা দেশে ব্যাপক গণহত্যার ঘটনা ঘটল। তারপরে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হলো। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনটি এক দফাতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। এ ক্ষেত্রে কোটা নিয়ে  কোনো বিদেশিদের আগ্রহ থাকবার কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়? আমার কাছে  তো এটা তাদের আগ্রহের বিষয়ই মনে হয় না। আমরা গত ১৫ জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত যদি  দেখি, পুরো আন্দোলনেই তো দেখতে পাচ্ছি কারা সক্রিয়। বিদেশিরা থাকলে তো আপনি টের  পেতেন। এখানে প্রথম দিকে বিএনপি আছে জামায়াত আছে জাতীয় পার্টি আছে কোনো দলকেই তো তেমন সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও সরকার তাদের পেছন থেকে ধরবার  চেষ্টা করছে। ছাত্র আন্দোলন খুব দ্রুত এগিয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই তো ছাত্রদের এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। আর বাইরের যারা আছে তাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং তো আরও পরে আসবে। কাজেই এই জায়গায় বাইরের সংশ্লিষ্টতার যে কথা বলা হচ্ছে এটা হলো ‘দুর্বল বসে বসে খালি অন্যের বদনাম করে’, এমনটাই মনে করি। মুক্তিযুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তানি বাহিনী নিরীহ মানুষের ওপর সামরিক আক্রমণ শুরু করে তখনই কিন্তু এই স্বাধীনতা যুদ্ধের গুণগত চরিত্রটা বদলে যায়। এবারের ছাত্র আন্দোলনেও সেটা হয়েছে। যখনই ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো হলো, গণহত্যা ঘটল, তার পরপরই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ল এক দফার আন্দোলনে। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা একেবারে দেশের মাটিতে অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট, তরুণ প্রজন্ম কর্তৃক পরিচালিত। তরুণ প্রজন্মের যদি বক্তব্য শুনেন দেখবেন তাদের সবগুলো কথা কিন্তু সম্মুখমুখী এবং মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা বলি তার সঙ্গে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। তারা সমতার কথা বলছে, তারা ন্যায়বিচারের কথা বলেছে, তারা গণতন্ত্রের কথা বলছে। কাজেই তাদের এই বক্তব্যগুলো কিন্তু খুবই আধুনিক। তারা সাংগঠনিক নতুনত্ব ও দক্ষতাও দেখিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? অর্থনীতির পরিস্থিতি তো খারাপই। পশ্চিমা বিশ্ব সমস্যা থেকে উত্তরণে সরকারকে কী ধরনের সহায়তা করবে আশা করেন?

এম হুমায়ুন কবির : প্রধান বিষয়টা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। তারপর, আপনাকে অর্থনীতি চালু করতে হবে এবং আপনাকে শেষ পর্যন্ত একটা নির্বাচন করতে হবে। আপনি সংস্কার করতে চান, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আপনাকে করতে হবে। এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য আপনাকে সমর্থন করবে কারণ তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থা চায়। আমি পড়ছিলাম ইকোনমিস্ট পত্রিকা বলছে যে বাংলাদেশকে ফেইল করতে দেওয়া যায় না; ফোর্বস গত পরশু বলেছে যে, বাংলাদেশকে সমর্থন করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে তারা আপনাকে সমর্থন করবে, এটা এক নম্বর। দুই নম্বরে আপনি আসেন অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য তারা আপনাকে সাহায্য করবে। অলরেডি ফোর্বস বলেছে, যারা ইম্পোর্টার আছো তোমরা বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে সাহায্য করো, বাংলাদেশের এই সমর্থন প্রয়োজন। প্রফেসর ইউনূসের ফেসভ্যালু ও গ্রহণযোগ্যতার কথা ধরে যদি বলি, তাহলে আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি পকেট খুলে সাহায্যে রাজি আছে। কাজেই তারা আমাদের সাহায্য করবে। এবার আসেন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে, এটা এই সরকারে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিশুদ্ধকরণসহ যাবতীয় সংস্কার করতে পাশ্চাত্য জগৎ তাকে পুরোপুরি সমর্থন করবে। কাজেই আমাদের প্রয়োজন এবং তাদের প্রত্যাশার মধ্যে একটা সাদৃশ্য আমি দেখতে পাচ্ছি। সময় দিতেও তারা রাজি। আপনি যদি যুক্তি দিয়ে তাদের বোঝাতে পারেন তাহলে তারা মানবে। কারণ দেখেন, ৯১ সাল থেকে গত ৩০ বছরের সব সরকারই স্বৈরাচারী স্বভাব দেখিয়েছে। এটা যদি বন্ধ করতে চান তারা সাহায্য করবে, আমি আশাবাদী।

দেশ রূপান্তর : আপনি ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক নতুনত্বের কথা বলছিলেন। গত কয়েকদিনে পাকিস্তান ও ইন্ডিয়ায় তরুণ প্রজন্মের লোকজন রাস্তায় নেমেছে। এখানে কি দক্ষিণ এশিয়াতে আমাদের এই ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন?

এম হুমায়ুন কবির : একটা জিনিস লক্ষ করবেন আমাদের ছাত্ররা অসাধারণ একটা দক্ষ নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তুলেছে। দেখেন, আপনি ৬ জনকে বন্দি করে রাখলেন কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি সেটা খেয়াল করেছেন? এটা আন্দোলনের একটা নতুন চেহারা দিয়েছে। আমরা ১১ সালে তিউনিসিয়ায় আরব বসন্ত দেখেছি, তারপর ইজিপ্টে দেখেছি, যেটা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে ‘বাংলা বসন্ত’। কেন বাংলা বসন্ত বলেছি? আপনি লক্ষ করবেন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল না, একেবারেই ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে ছাত্ররা অসাধারণ একটা নেতৃত্বের  যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তাদের লোকজনকে বন্দি করে রাখার পরেও কিন্তু তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে পেরেছে। কারণ তাদের একটা ডি-সেন্ট্রালাইজড লিডারশিপ, কালেকটিভ লিডারশিপ তৈরি করেছে, এটা একটা ইনোভেশন বলে আমার কাছে মনে হয়। আর আপনি যদি তাদের বক্তব্য শুনেন, সবগুলো কথা কিন্তু অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য এবং অত্যন্ত সময়োপযোগী। তাদের স্লোগানগুলো খেয়াল করলে আপনি দেখবেন সবগুলোই নতুন, এগুলোর কোনোটিই আগের স্লোগান না, কর্মসূচিও নতুন। তারপর পরবর্তী সময়ে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়াটাও একটা নতুন উপাদান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ঘটেনি কোনোদিন। আমার ধারণা, আমরা একটা নতুন কাঠামো বা নতুন কিছু একটা দেখবার যে প্রত্যাশা অনেকদিন ধরে করে আসছি, সেটা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যে বিকল্প হতে পারে, সেই বিকল্প তারা করে দেখিয়েছে। এটা একটা অভিনব ঘটনা, একটা নতুন জিনিস তারা তৈরি করেছে। যেটা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, সারা বিশ্বের লোকেরা এটার অনুকরণ করতে পারে। ১৯৬৮-তে আমরা যখন আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন করি তখন কিন্তু সারা পৃথিবীতে এ রকম ছাত্র আন্দোলন হচ্ছিল, বিভিন্ন জায়গায়। এখন বাংলাদেশে যেটা দেখিয়েছে এটা দেখে অন্যরা যে অনুপ্রাণিত হবে না এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে যে বিকল্প তৈরির চেষ্টা করবে না সে কথা কিন্তু বলা যাবে না।

দেশ রূপান্তর : আরব বসন্ত কিন্তু কোনো ফল দিতে পারেনি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই ছাত্র আন্দোলনের সফলতা নিয়ে তো কিছু ভয় ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে। ধরেন, কিছু উপাদন তো শঙ্কা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের এস্টাবলিশমেন্ট, পলিটিক্যাল পার্টিগুলো কি ছাত্রদের নেতৃত্ব আগাতে দেবে? তারপর ৩২ এর জাদুঘর পোড়ানো ও সেখানে ১৫ আগস্ট শোক পালনে বাধা দেওয়া, এসব অ্যালার্মিং না? হিংসাত্মক রাজনীতির মধ্যেই ঘুরপাক খাওয়ার শঙ্কা জাগায় না?

এম হুমায়ুন কবির : বাংলাদেশের এই ছাত্র আন্দোলন আরব বসন্তের মতো অসফল হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং সফল হওয়ার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। আর আমি ১৫ আগস্টের ঘটনাকে অতটা অ্যালার্মিং মনে করছি না। কারণ হচ্ছে, হাসিনা সরকার কর্তৃক গণহত্যা এখনো কিন্তু দগদগে রয়েছে। মাত্র ১০ দিন সময় অতিবাহিত হয়েছে এবং আন্দোলনের উত্তাপ এখনো আছে। বেশিরভাগ আন্দোলনকারী ছাত্ররা, মেয়েরা বিশেষ করে অ্যাক্টিভ। আর এক্সিস্টিং  স্টেক হোল্ডারদের বিষয়টি আমি জানি না ভালোভাবে। আমি এখানে আরেকটু সহনশীল হওয়ার জন্য বলব। এটা সবাইকেই বলব। আন্দোলনের উত্তাপ এখনো বেশ আছে। আমি মনে করি অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সামনে যাওয়া যাবে না, নতুন সংস্কৃতি নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করে তবেই সামনে যেতে হবে এবং সেটা শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল হতে হবে।  সেটা আবার সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, আর তা করতে হলে আপনার সঙ্গে যার মতের পার্থক্য আছে তার সঙ্গে যুক্তি দিয়ে হয় উইনওভার করতে হবে বা পরাজিত হলেও একটা জায়গায় সেট হতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা কাঠামো তৈরি করতে ৩টি জিনিস লাগবে। অন্যের প্রতি সম্মান, অন্যের মতামত শোনা এবং বৈচিত্র্যকে সমর্থন বা গ্রহণ করা। এই মূল্যবোধ এবং কাঠামো থাকতে হবে। দায়বদ্ধতা থাকতে হবে, ক্ষমতার ব্যবহার জনগণের স্বার্থে হতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে এবং সর্বস্তরে আলোচনার জায়গা থাকবে কাঠামোগতভাবে। এরপর যদি প্র্যাকটিসে আসেন তাহলে আপনাকে অন্যপক্ষ ভয় করবে না, আপনাকে সমীহ করবে, অন্যপক্ষ আপনার সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজবে। এই তিনটা স্তরে যদি আমরা এগোতে পারি তাহলেই নতুন তরুণ প্রজন্মের যে প্রত্যাশা, তারা যে ন্যায়বিচারের কথা বলছে, তারা যে গণতন্ত্রের কথা বলছে, তারা যে দায়বদ্ধ ব্যবস্থার কথা বলছে, সংস্কারের কথা বলছে আগামী দিনে এই বিষয়গুলো পথ খুঁজে পাবে। পুরনো পদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা যদি চালু থাকে তাহলে এই আন্দোলন এক পর্যায়ে ক্ষীণ হবে, শক্তি হারিয়ে ফেলবে। আজ তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সাদৃশ্য তৈরি করাটাই আমাদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ওরা কিন্তু অসাধারণ একটা কাজ করেছে। যেখানে অল পলিটিক্যাল পার্টিস ফেইল সেখানে ওরা সফল হয়েছে। না হলে যে কী হতো! যদি এই অবস্থা চলত আর ১০ বছর, আমি জানি না কী ঘটত বাংলাদেশে। কাজেই আমি মনে করি ওদের চিন্তাটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আমাদের যদি শক্তিশালীভাবে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে হয় সেক্ষেত্রে জাতীয় ইতিহাস তো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধরেন, জিয়াকে তো আগের সরকার পাকিস্তানের এজেন্ট পর্যন্ত বলতে চেয়েছে, আবার এবার ৩২ নম্বর পুড়িয়ে দেওয়া হলো।

এম হুমায়ুন কবির : এখানে আমাদের সময় দিতে হবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর যে জায়গা সেই জায়গায় উনাকে রাখতে হলে যারা বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করে বলে দাবি করেন তাদেরও সহনশীল হতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে সবার মধ্যে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে তাদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। ৭১ সালে যখন যুদ্ধ করেছি তখন কিন্তু গ্রামের মেয়েরা বঙ্গবন্ধুর যাতে ফাঁসি না হয় তার জন্য রোজা রেখেছে, এটা আমার নিজের চোখে দেখা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ইতিটা বিয়োগান্তভাবেই হয়েছে। তারপরে এই গত ১৫ বছরে হাসিনার সরকার যেটা করেছে, তার প্রভাব পড়েছে। বঙ্গবন্ধুকে প্রজন্মের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করানোটা তো আপনার  ইতিবাচকভাবে হতে হবে, জোর করে পারবেন না জোর করে হয় না। এটা করতে গেলেই সেটা ব্যাকফায়ার করার আশঙ্কা থাকে, এবং সেটা করেছে। বিষয়টা আমি ভবিষ্যতের ওপর  ছেড়ে দেব। কারণ বঙ্গবন্ধু এই দেশে এবং বাঙালি জাতির জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। এখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে কীভাবে দেখবে সেটা প্রজন্মই ডিসাইড করবে। আমি তাকে  প্রেসক্রিপশন দিলে হবে না। কাজেই বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিতে হবে। জিয়ার প্রসঙ্গেও তাই-ই। আমি বিতর্কে যাচ্ছি না। আমি শুধু এইটুকুই বলব যে আপনি প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন তৈরি করবেন যাতে করে তারা আমাদের জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা  বোধ করে। আপনি যদি সেটা তৈরি না করতে পারেন তাহলে প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

এম হুমায়ুন কবির : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়