অস্থির পরিস্থিতি ক্যাম্পাসে

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মেরামত দরকার

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যসহ প্রশাসনিক শীর্ষ পদগুলোতে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। এর ফলে ক্যাম্পাসে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম আবার কবে শুরু হবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের টানাপড়েন। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মেরামত দরকার বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে না থাকার অভিযোগ এনে ক্লাস বর্জন এবং অ্যাকাডেমিক পদ থেকেও শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি জানানো হচ্ছে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই অবস্থা। এ পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে গত ১৫ জুলাই থেকে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তখন বিএনপিপন্থি, বামপন্থি ও গুটিকয়েক সাধারণ শিক্ষক ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষক চুপ ছিলেন। বিশেষ করে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের বেশিরভাগ সদস্য চুপ ছিলেন বা ক্ষমতাসীনদের ভাষায় কথা বলেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন। এ ক্ষোভ থেকে আওয়ামীপন্থি অনেক শিক্ষকের ক্লাস বর্জন করেন শিক্ষার্থীরা।

গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে বেশি। যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানাননি, তাদের সঙ্গে সরাসরি বাগ্বিত-ায় লিপ্ত হয়েছেন ও ক্লাস বর্জনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থাকা শিক্ষকদের পদত্যাগ দাবি করেন তারা। দাবি অনুযায়ী উপাচার্য, প্রক্টর, বেশ কিছু হলের প্রভোস্ট পদত্যাগও করেন। তারপরও ক্ষোভ কমেনি শিক্ষার্থীদের। এবার বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকদেরও পদত্যাগ দাবি করছেন তারা।

গত রবিবার  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. এম ওহিদুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগ ও বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ইনস্টিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের পদত্যাগের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। আরও অন্তত ২০টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের প্রধানদের পদত্যাগ দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে পারছেন না শিক্ষকরা। অনেকে অফিসেও আসছেন না। এসব পদ রাজনৈতিক বিবেচনায় নয় বরং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়ায় পদত্যাগ করতে চান না তারা। এসব শিক্ষকের অনেকে আওয়ামীপন্থি রাজনীতি করলেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছিলেন না বরং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করেছেন। তারাও ক্ষোভের মধ্যে পড়েছেন; ক্লাসে ফেরা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, এমন পরিস্থিতির জন্য শিক্ষকরাই দায়ী। অরাজনৈতিক আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে চুপ ছিলেন অনেক শিক্ষক। যেখানে অন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন, বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। আর আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা দলের গুণগান গেয়েছেন বা চুপ থেকেছেন।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাদ্দেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ পরিস্থিতির জন্য শিক্ষকরাই দায়ী। ক্ষমতার লোভে পড়ে তারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়লেও তারা এগিয়ে আসেননি। উল্টো অনেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তিরস্কার করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক চাই, দালালি করা কাউকে চাই না।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতির জন্য শিক্ষকরা দায়ী। শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়ানোয় তাদের শিক্ষার্থীরা বয়কট করছেন। আলোচনার মাধ্যমে হয়তো এ সংকট কাটানো সম্ভব। যদি শিক্ষকরা আগামীতে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন আর শিক্ষার্থীরা যদি তা গ্রহণ করেন।’

শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য কিংবা অবস্থান নিয়ে থাকলেও তা করেছেন গুটিকয়েক শিক্ষক। কিন্তু এর খেসারত দিতে হচ্ছে আওয়ামীপন্থি সব শিক্ষককে। প্রশাসনিক পদ দলীয় হলেও অ্যাকাডেমিক পদ তো দলীয় নয়। এখানে শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে বলা চলে। এ পরিস্থিতিতে ক্লাস করানো কঠিন। শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, তারা সিস্টেমের শিকার, চাইলেও শিক্ষার্থীদের পক্ষে সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি।

ঢাবির একটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কখনো রাজনৈতিক ফোরামে গিয়ে বক্তব্য দিইনি, যতটা সম্ভব শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছি। এরপরও নীল দল করায় শিক্ষার্থীরা আমার পদত্যাগ দাবি করছে। কিন্তু এটা তো কোনো প্রশাসনিক পদ নয়। তারা এতটাই ক্ষুব্ধ যে, আমার অফিসে যাওয়া নিয়েও ভয়ে থাকি। শিক্ষক হিসেবে এমন পরিস্থিতি দেখা আমাদের জন্য কষ্টের। অনেক শিক্ষক শিক্ষকতা ছেড়ে দেবেন কি না ভাবছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সামাজিক যোগাযোগমাধমে একটা স্ট্যাটাস দিলেও শিক্ষক নেতাদের কাছে তার জন্য জবাবদিহি করতে হয়েছে। এমন অসংখ্য শিক্ষক চাইলেও শিক্ষার্থীদের পাশে সরাসরি দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু আমরা অনেকেই বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। এ আন্দোলন কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি ভয়াবহ হতে পারে।’

শিক্ষক নেতারা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদলে পদত্যাগের হিড়িক নতুন নয় বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানো একদমই নতুন। আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাদের।

ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেক শিক্ষক। এ কারণে এমন পরিস্থিতি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এমন অবনতি কষ্টদায়ক। এমনটা আর কখনো হয়নি। আমরা চাই দ্রুত এ সংকট দূর হোক। আমরা শিক্ষকরা তো শিক্ষার্থীদের জন্যই।’

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে একটি মহল ঢাবির শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চরিত্র হননের মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে, ঢাবি শিক্ষক সমিতির ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি মানববন্ধনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছবির মাধ্যমে শিক্ষক সমিতিকে ড. ইউনূসের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।’