কলকাতা জুড়ে বিক্ষোভ চলছেই মামলা এখন সুপ্রিম কোর্টে

পশ্চিমবঙ্গের আরজি কর মেডিকেল কলেজে কর্তব্যরত একজন নারী চিকিৎসককে খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদে উত্তাল পুরো ভারত। গত শনিবার দেশটি জুড়ে চলছে চিকিৎসকদের কর্মবিরতি। সেদিন কিছু আইনি অগ্রগতিও হয়েছে ওই ঘটনার। তবে এরপরও গতকাল কলকাতার রাজপথ ছিল আন্দোলনকারীদের দখলে। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এ ঘটনার দায় নিয়ে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। অবশ্য মমতা ও তার দল

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীরাও মৌমিতা দেবনাথ নামের ওই চিকিৎসকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চেয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ওই মামলা হাতে নিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চে থাকবেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্র। চলতি সপ্তাহেই ওই মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট।

আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মঙ্গলবার কোর্ট খুললে প্রথমেই এই মামলা শুনবে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। সূত্রের খবর, আরজি করের পুরো বিষয়টির ওপর নজর রাখতেই সরাসরি মামলা হাতে নিয়েছে দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। ওই ঘটনায় তদন্তের গতিপ্রকৃতি, হাসপাতাল ও রাজ্যের ভূমিকা খতিয়ে দেখবে শীর্ষ আদালত। এ ছাড়া কর্মস্থলে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও শুনানি করতে পারে সর্বোচ্চ আদালত। হাইকোর্টে ওই ঘটনা নিয়ে করা জনস্বার্থ মামলার সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী জানান, সুপ্রিম কোর্ট নিজে ওই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে আপাতত সেখানে সিবিআই তদন্তসহ পুরো বিষয়টি নিয়ে শুনানি হবে।

গত ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় দেশ জুড়ে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ শুরু হয়। অনেক হাসপাতালে কর্মবিরতি করেন চিকিৎসকদের একাংশ। আরজি কর ঘটনায় একাধিক জনস্বার্থ মামলা হয় কলকাতা হাইকোর্টে। উচ্চ আদালত পুলিশের হাত থেকে মামলা নিয়ে সিবিআইকে দিয়েছে। ওই ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। গত দুদিন ধরে সিবিআই অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। যদিও এখনো পর্যন্ত তারা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ঘটনার পরের দিন শুধুমাত্র পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একজন। তিনি পেশায় সিভিক ভলান্টিয়ার।

আরজি করের মামলায় প্রথম থেকেই হাইকোর্টের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন রাজ্য ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। ওই হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে ‘পুরস্কৃত পদে’ নিয়োগ করা নিয়েও রাজ্যের সমালোচনা করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম মন্তব্য করেছিলেন, আরজি করের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

এদিকে গত শনিবার আরজি করের সাবেক অধ্যক্ষ এদিন দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই অফিসে হাজিরা দেন এবং ঘটনার অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়ের গতিবিধি যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। নিহত চিকিৎসকের (৩১) দেহের ময়নাতদন্তে চরম যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু এ ঘটনাকে কর্র্তৃপক্ষ প্রথমে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার সহকর্মী এবং বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকসহ সাধারণ মানুষ নির্যাতিতার ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

আনন্দবাজার বলছে, ওই চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করার ঘটনায় তার সহকর্মীরাও জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ নিহত চিকিৎসকের বাবা-মায়ের। হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এবং ইন্টার্নের নামও তারা সিবিআইকে জানিয়েছেন।

পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরজি করে নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে জানিয়েছেন, সঞ্জয় নামে একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুনের সঙ্গে মাত্র একজন জড়িত বলে তারা মানতে নারাজ। বরং তারা মনে করেন, এ ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন। পুরো ঘটনাতেই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জড়িত বলে তাদের বিশ্বাস।

নিহত চিকিৎসকের সঙ্গে কাজ করতেন, এমন কয়েকজনের নাম সিবিআইকে জানিয়েছেন তার বাবা-মা। তাদের সন্দেহ করার কারণও জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী কয়েকজনসহ এ ঘটনায় ৩০ জনকে চিহ্নিত করেছে সিবিআই।

সিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা যাদের নাম বলেছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কলকাতা পুলিশের যারা প্রাথমিকভাবে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে সিবিআই।

এদিকে মৃত চিকিৎসকের সহকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, রাত ২টার পর মেয়েটি ঘুমোতে গিয়েছিল। তার আগে পর্যন্ত সে সহকর্মীদের সঙ্গেই ছিল। পরের দিন সকাল ৯টায় দেহ উদ্ধার হয়। এতটা সময় তার খোঁজ কেউ নিলেন না কেন?’

তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার জানিয়েছে, আরজি করে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় ওই রাতে যৌনপল্লীতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে আরজি করে ঢোকেন তিনি। তারপরেই নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্তের গতিবিধি যাচাই করে দেখছেন গোয়েন্দারা।

কলকাতা পুলিশ জানায়, সেদিন রাত ১১টা নাগাদ আরজি করের সিসিটিভিতে অভিযুক্ত সঞ্জয়কে দেখা যায়। তখন তিনি হাসপাতালে ঢুকেছিলেন। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বেরিয়ে যান। পরে আবার হাসপাতালে ফেরেন। জরুরি বিভাগের চারতলার সেমিনার হলের কাছে সিসি ক্যামেরায় তাকে ভোর ৪টার দিকে দেখা যায়। ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট পর সেখান থেকে আবার বেরিয়ে যান তিনি।