মাদারীপুরের শহীদ হারুন সড়কের দরগাশরীফ এলাকার বাসিন্দা রাজধানীর বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ভিটেমাটি হারিয়ে অসহায় হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু বিচার না পেয়ে হতাশ হয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিচার চেয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার (২১ আগস্ট) এ ঘটনার প্রতিকার ও বিচার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন ফাতেমা।
তিনি জানান, পূর্ব থেকে চলে আসা দখলদারিত্বের ধারাবাহিকতায় এবার গণঅভ্যুত্থানে যোগদানের অপরাধে বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে আমার মায়ের ভিটেমাটি ভাঙচুর করে জায়গা দখলে নিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা। স্থানীয় ওই আওয়ামী নেতার নাম মাহবুব আহসান শিমুল। তিনি মাদারীপুর ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের অনুসারী বলে জানা যায়। শিমুল পৌরসভার মেয়র ইয়াদ আলীর ঘনিষ্ঠজন ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার আত্মীয় পরিচয়ে এলাকায় গরিব মানুষের ওপর নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ করেন ফাতেমা।
ভাঙচুর ও দখলদারিত্বের বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী ফাতেমা জানান, গত ৮ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী শিমুল গংরা তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এমতাবস্থায় ভয় ও আতঙ্কে অন্যত্র দিন কাটছে তার পরিবারের।
তিনি বলেন, আন্দোলনে জড়িত থাকায় ভয় তো ছিলই। প্রতিবেশী একজন যখন খবর দিল তখন গিয়ে দেখি আমাদের ঘর ভেঙে যাবতীয় মালপত্র লুটপাট করে তারা। আমি বাড়ি ভাঙচুরকারী কিছু লোককে আমাদের বাড়িসহ চারদিকে বেড়া দিতে দেখি এবং তাদের নিষেধ করায় আওয়ামী লীগের বাহাউদ্দিন নাছিম গ্রুপের মাহবুব আহসান শিমুল আমাকে মারতে আসে এবং নানাভাবে হুমকি দেন। সে আমাকে বলেন, তোদের পতন করা হবে। প্রয়োজনে খুন ও গুম করা হবে। তখন আমাকে ও আমার ভাইকে ধরে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে শিমুলের বাহিনীর কাজল, সাহিদ খান, শাহানা নাসরিন রুবি, অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন।
ফাতেমা বলেন, আমার প্রতিবেশী চারজন ছিল তাদের জিজ্ঞেস করায় তারা বলে মাহবুব আহসান শিমুল ঘর ভাঙছে এবং আমাদের বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়ে জায়গাটা দখল করেছে। থানা তখনও পুলিশশূন্য। এমতাবস্থায় আমি সেনাবাহিনীর কাছে যাই। তাদের ওখানে অভিযোগ দেই তারা আসতে আসতে আমার ঘর ভেঙে শিমুলের লোকজন বেড়া দিয়ে ফেলে।
ভুক্তভোগী বলেন, তখন শিমুল সেনাবাহিনীতে তার বড় বড় আত্মীয় আছে বলে পরিচয় দেন। এতে সেনাবাহিনী তাকে ধমক দিয়ে লাঠি চলানোর কথা বলে এবং আইনের নোটিশ ছাড়া এই সময়ে ঘরবাড়ি ভাঙার জন্য তাকে কোর্টে বিচার করা হবে বলে এবং আর কিছু করতে নিষেধ করে যায়। কিন্তু তারপরও শিমুল তার লোক দিয়ে গেইট বানায়। আমি বলি সেনাবাহিনী নিষেধ করার পরও গেইট বানাচ্ছেন কেন? তখন তিনি মাদারীপুর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা মুরাদ সাহেবের নির্দেশে এসব করছে বলে জানান। নিজেকেও তখন বিএনপির লোক দাবি করেন।
ফাতেমা বলেন, বিএনপি নেতার আদেশে এমনটা করার কথা জানালে আমি বিএনপির সেই নেতার বাড়ি যাই এবং তাকে জিজ্ঞাসা করি। তখন সেই নেতা সব অস্বীকার করে বলেন আমি এসবের সাথে জড়িত না। শিমুল আমার ক্লাসমেট, তাই হয়তো আমার নাম ব্যবহার করেছে। আমরা বন্ধু হতে পারি কিন্তু সে আওয়ামী লীগ। পৌরসভা চেয়ারম্যান ইয়াদও আমার বন্ধু। আমরা দুই দল করি। শিমুল ইয়াদের পক্ষের লোক এতকাল আওয়ামী লীগের থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, এখন রাতারাতি বিএনপির নাম ভাঙিয়ে দখল শুরু করে দিয়েছে। আমি তার এসব সাপোর্ট করি না। সে তোমাদের ঘর ভাঙার পরে রাতে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরে বলছে বন্ধু ভুল করে ফেলছি, ঘরতো ভেঙে ফেলছি তুই আমাকে বাঁচিয়ে নে। আমি তাকে বলছি তুমি ভুল করছ। রাষ্ট্রের এই অবস্থায় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এটা তোমার করা উচিত হয়নি।
ফাতেমা আরও বলেন, তখন আমি মুরাদ সাহেবকে বলি, আপনার নাম করে যখন আমার ঘরবাড়ি ভাঙল তখন সামাজিকভাবে আপনি শালিসির মাধ্যমে সমাধান করে দেন। বিএনপি নেতা আমার এই প্রস্তাব অস্বীকার করেন। আশপাশের প্রতিবেশিরাও মুখ খুলে না তাদের ভয়ে। ওদের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিবেশিরাও এটার সমাধান করতে ভয় পায়। সামাজিকভাবেও আমি এটার সমাধান পাইনি। মেয়র ইয়াদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাইনি। তিনি পলাতক।
ভুক্তভোগী এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, শিমুল যখন আমার ঘর ভাঙে তখন আশপাশের ২০টা পরিবারের চলার পথ আটকিয়ে বেড়া দেন। তখন এক প্রতিবেশী ইউনুস প্রতিবাদ করে এবং শিমুলের গায়েও হাত দেন। তখন তিনি রাস্তা ছেড়ে বেড়া দেন এবং বলে রাস্তা দিলাম শর্ত একটাই তারা (আমরা) যাতে এখানে না আসতে পারে।
ফাতেমা বলেন, আমার মা-বাবা দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর যাবৎ বসবাস করেছে এই জায়গায়। জায়গার মালিক মৃত সামছুল হককে বায়নাও করেছে জমি বাবদ। কিন্তু একটা সময় সে বলে এই জমির দলিল হবে না, জমির মালিক সরকার। ১/১ খতিয়ান ভুক্ত তাই ডিসি স্যার বরাবর দরখাস্ত করতে হবে সেই অনুযায়ী আমার মা ০৪ শতাংশ ভূমি দাবি করে এবং তা তার নামে রেকর্ড হয়। তার নামে সরকারিভাবে বরাদ্দ হওয়ায় শিমুল ও তার বোন রুণি (সাবেক মন্ত্রী শাহজান খানের বান্ধবী) আমার বাবাকে অনেক মারধর করে ৪ দিন গুম করে রাখে এই জমি ছেড়ে যাওয়ার জন্য এবং তখন আমাদের বড় ঘর ভেঙ্গে ফেলে তবুও ছোট একটি ঘরে কোনোক্রমে দিনাতিপাত করি। নানাভাবে বাধা দেওয়ার পরও কয়েক বছর পর ঐ ঘর মেরামত করি। ১৪৪/৪৫ মামলা দায়ের করি যাতে আবার ঘর ভাঙ্গতে না পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাদের ক্ষমতা বলে আমার মামলার বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়ে খারিজ করে এবং এই আওয়ামী লীগের নেতাদের থেকে নানা ধরণের হুমকি আসতে থাকে। যেখানে শিমুল ২০০৬ সালে দলিল করে ৮ শতাংশ ভূমি কিন্তু ১৯৯৯ সালে আমার নামের দরখাস্তর স্থলে ১/১ খতিয়ানে এই দাগে রেকর্ড হয় ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আমি থানা/পুলিশ, মামলা মোকদ্দমার মাধ্যমেও এটার কোন সমাধান পাইনি। এ বিষয়ে বিগত দিনে দেনদরবার ও মামলা মোকদ্দমা করেও পেয়েছি হয়রানি, নির্যাতন, হত্যার হুমকি। অবশেষে, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সারাদেশে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর হয়। ঠিক তখন শিমুল খোলস পালটিয়ে রাতারাতি বিএনপি নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করে। দখল করে আমাদের ভিটেমাটি।