মানুষ বাঁচুক

দেশের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। অন্তত ৯টি জেলায় কয়েক লাখ মানুষ বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বাঁধ খুলে দেওয়ায় এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এমন কিছু জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা গেছে, সচরাচর যেসব জায়গায় বন্যা হতে দেখা যায় না। ফলে, অনেক মানুষ হতভম্ব হয়েছেন। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরার ডুম্বুর হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্রজেক্ট বা ডুম্বুর গেট খুলে দিয়েছে ভারত। ফলে পাহাড়ি ঢল, ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পানিতে হঠাৎ বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এই তিন জেলাসহ ৯টি জেলায় বন্যা হয়েছে। বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ওঠায় বিপাকে পড়েছেন এসব জেলার বেশিরভাগ মানুষ। এ ছাড়া, বন্যার পানিতে গ্রামীণ সব সড়ক ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো ফেনী, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও খাগড়াছড়ি।

বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ফেনীতে। জেলার তিন উপজেলা পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ। বাসিন্দারা বলছেন, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন ফেনীর বাসিন্দারা। গত ৩৬ বছরে অনেকবার বন্যা হলেও এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। নৌকায় করে এসব এলাকায় ত্রাণ দিতে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।

কুমিল্লার গোমতী নদীতে পানি সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। জেলার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, লাকসামেও ছয় দিনের অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সাতটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টিতে ভেসে গেছে পুকুর ও মৎস্য প্রজেক্টের মাছ। জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে নোয়াখালীতেও। জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে আটটিতেই জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিন দিন ধরে বেশিরভাগ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। নোয়াখালী শহরের লক্ষ্মীনারায়ণপুর, হরিনারায়ণপুর, কাজি কলোনি, ল’ইয়ার্স কলোনি, রশিদ কলোনি ও কৃষ্ণরামপুর এলাকার বেশিরভাগ বাসাবাড়ির আঙিনায় বৃষ্টির পানি থইথই করছে। খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। খাগড়াছড়ি সদর ও পানছড়ি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দীঘিনালা উপজেলায় আরও অবনতি হয়েছে। জেলার মহালছড়ি উপজেলার সঙ্গে মুবাছড়ি ইউনিয়নের সংযোগ সড়কের কাপ্তাইপাড়া সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ভেঙে গেছে। ফলে ওই এলাকার সঙ্গে গতকাল থেকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ভারতের ত্রিপুরার ধলাই জেলায় গোমতী নদীর ওপরে থাকা ডুম্বুর বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার কারণেই বন্যা হয়েছে তা ঠিক নয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা উল্লেখ করতে চাই যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গোমতী নদীর অববাহিকা (ক্যাচমেন্ট) এলাকায় কয়েক দিন ধরে এ বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে এ বন্যা মূলত বাঁধের ভাটির দিকের বৃহৎ অববাহিকার পানির কারণে ঘটেছে।’ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বুধবার (২১ আগস্ট) থেকে পুরো ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে পানির চাপে বাঁধ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছাড়ার ঘটনা দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাঁধের মুখ খুলে দেওয়ার ফলেই বন্যা হয়েছে এই কথাটি ঠিক না হলেও, বাঁধের মুখ খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আগেই সতর্ক না করায় আক্রান্ত মানুষজন কোনোরকম প্রস্তুতিও নিতে পারেনি। ফলে, মানবিক বিপর্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ভারতের এই আচরণকে ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বন্যা আবারও এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের গুরুত্বই নির্দেশ করে। এই মুহূর্তে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। ইতিমধ্যেই তিন বাহিনীসহ উদ্ধারকর্মে দক্ষদের সরকারের তরফ থেকে কাজে নামানো হয়েছে। সমস্ত সম্পদ ও ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে হবে, বাঁচাতে হবে।