সাশ্রয়ী আমন আবাদে বড় ধাক্কা

বন্যায় অন্তত ১১ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে রোপা-আমনের ক্ষেতগুলো। কৃষকের কাছেও পর্যাপ্ত বীজ নেই। বীজতলা তৈরির উপযোগী ভূমিও নেই। বীজপ্রাপ্তি সাপেক্ষে পানি নেমে যাওয়ার পর বীজতলা তৈরি করতে করতে শেষ হয়ে যাবে আমনের মৌসুম।

১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমনের চারা রোপণ করতে না পারলে ধানের সবচেয়ে সাশ্রয়ী মৌসুম বলে বিবেচিত আমন চাষ থেকে বঞ্চিত থাকবে বিশাল একটি এলাকা।

সাম্প্রতিক বন্যায় এখনো পানির নিচে রয়েছে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার

কৃষিজমি। এসব এলাকার অনেক জায়গায় আমন চারা রোপণ করা হয়ে গিয়েছিল। কোথাও কোথাও আমনের বীজতলা ছিল, আবার কোনো কোনো এলাকায় আমন রোপণের অপেক্ষায় ছিল। কোথাও কোথাও আউশ ধান মাঠে ছিল, কাটার উপযোগী হয়নি। সাম্প্রতিক আচমকা বন্যায় সবই পানির নিচে চলে গেছে। ধানের পাশাপাশি এসব এলাকার অনেক জমিতে সবজির চাষ হয়েছিল, বন্যায় সেগুলোও পানির নিচে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্যায় চট্টগ্রামে ৫৮ হাজার ৪৯১ হেক্টর, কক্সবাজারে ১৩ হাজার ১৬২, নোয়াখালীতে ৪৩ হাজার ৬০১, ফেনীতে ৩৮ হাজার ৭৪ ও লক্ষ্মীপুরে ৪১ হাজার ৪১৭ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে আমনের বীজতলা ছিল ১৪ হাজার ৪৪১ হেক্টর, আবাদকৃত আমন ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৪৪, বোনা আমন ছিল ৩ হাজার ২৪০ ও আবাদকৃত আউশ ছিল ২৫ হাজার ৮৯১ হেক্টর এবং বাকিগুলো ছিল সবজিক্ষেত।

এসব এলাকায় এখন আমনের চাষ কীভাবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুর্গত এলাকায় সবার আগে পানি নামতে হবে। পানি নামার পর বীজতলা তৈরি ও সেখান থেকে ধানের চারা করার পর রোপণ করতে করতে আমনের মৌসুম প্রায় শেষপর্যায়ে চলে যাবে।

বন্যাদুর্গত মিরসরাইয়ের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ‘মিরসরাই, ফেনী, নোয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বীজতলা তৈরির মতো উঁচু জমিও নেই। তাই বীজতলা তৈরি নিয়ে শঙ্কায় আছি। এখনই যদি বীজতলা তৈরি করা না যায়, তাহলে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমনের চারাও রোপণ করা যাবে না।’

আমনের বীজ নিয়ে একই শঙ্কার কথা জানিয়ে নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১০০ কেজি ধানের বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের চারা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) বীজ বা চারা সরবরাহ করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। তবে নোয়াখালীতে বীজতলা তৈরির কোনো উপযোগী জায়গা নেই।’

বীজ কে দেবে : বীজের উৎসের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিএডিসি বীজ ধান বিপণন করে থাকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শস্য বিভাগের পরিচালক ড. কাজী আফজাল হোসেন বলেন, আমন ধানের ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়সী চারা রোপণ করতে হয়। এই চারা ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রোপণ করতে হবে। বন্যার পানি নামতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। এই মুহূর্তে বন্যাকবলিত এলাকায় বীজতলা তৈরি করে আমনের চারা সরবরাহ করা কষ্টসাধ্য হবে।

তাহলে বিকল্প কী, এমন প্রশ্নে ড. আফজাল বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকার বাইরে থেকে চারা এনে দুর্গত এলাকায় সরবরাহ করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে ব্রি আর-২২ ও ২৩ জাতের ধান সবচেয়ে কার্যকর হবে। এগুলো একটু দেরিতে রোপণ করলেও ফলন পাওয়া যায়।

ধানের বীজ কোথায় পাওয়া যেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কৃষকের কাছে সংরক্ষিত কিছু বীজ থাকে। এ ছাড়া বিএডিসি ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ধানের চারা সরবরাহ করতে পারে।

মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষকের কাছে ধানের বীজ প্রায় নেই বললেই চলে। বেসরকারি কিছু ডিলারের কাছে বীজ রয়েছে। তবে এসব বীজও কোনো কোনো এলাকায় কাজে আসবে না, কারণ বীজতলা তৈরির জায়গা নেই। এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মোহাম্মদ আবীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে সরকারিভাবে বীজ প্রদানের আমরাই একমাত্র সংস্থা। আমাদের কাছে দেড় হাজার কেজি ধানবীজ রয়েছে। এসব ধানবীজ দিয়ে মধুপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বীজতলা তৈরি করে চারা আকারে বন্যাদুর্গত এলাকায় সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’

তবে বিএডিসির পাশাপাশি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটও বীজতলা তৈরি করছে। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (বীজ বিভাগ) ড. পার্থ সারথী বিশ্বাস বলেন, ‘বন্যা উপদ্রুত এলাকায় বিআর-২২,২৩ ও ৪৬ জাতের ধান বেশি চাষ করা হয়। এসব ধান একটু দেরিতে রোপণ করলেও ফলন পাওয়া যায়। আর যেহেতু বন্যা-পরবর্তী সময়ে চাষ করা হবে, তাই ফলন বেশি পাওয়া যাবে।’

কীভাবে চারা সরবরাহ করা হবে এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছি। বন্যার পানি নেমে গেলে আমরা উপদ্রুত এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে চারা সরবরাহ করব। আশা করছি চারার সংকট হবে না।’

বর্তমানে চলছে আমনের রোপণ মৌসুম। আর বৃষ্টিনির্ভর এই আমনে সেচের প্রয়োজন হয় না বলে কৃষকের খরচ কম হয়। আর কোনো কারণে যদি আমন চাষ করা না যায়, তাহলে শীতকালীন সবজি আগেভাগে চাষ করা হবে।