শরীরে বুলেট নিয়ে কাতরাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে আহত ফেনীর সোনাগাজীর কলেজ ছাত্র রিদোয়ান। গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে যুবলীগ-ছাত্রলীগ এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে গুলিবিদ্ধ হয় রিদোয়ান। তার শরীর থেকে এখনো সব গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। একমাত্র ছেলের এ অবস্থায় দিশেহারা দিনমজুর বাবা। এ অবস্থায় বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
আহত রিদোয়ান হোসেন ফেনী সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। সে সোনাগাজী উপজেলার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের দিনমজুর ইব্রাহিমের ছেলে।
জানা যায়, গত ৪ আগস্ট বন্ধুদের সাথে ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন রিদোয়ান। মহিপাল ফ্লাইওভার এর পশ্চিম অংশে হিরা কনফেকশনারির সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। ওই সময় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রিদোয়ান। গুলিবিদ্ধ রিদোয়ানকে সহপাঠীরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্তমানে শরীরে বুলেট নিয়ে বাড়িতে কাতরাচ্ছে রিদোয়ান।
রিদোয়ানের বাবা ইব্রাহিম বলেন, ‘আমার ৪ মেয়ে, ১ ছেলে। আন্দোলনের সময় স্বৈরাচার সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনির গুলিতে আমার একমাত্র ছেলে আহত হয়ে বিছানায় কষ্টে দিন পার করছে। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিনা। তাই সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ডাক্তারের পরামর্শে গত রবিবার (১৮ আগস্ট) এক্সরে করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে জানা যাবে এখনো কয়টা বুলেট শরীরে রয়েছে।
রিদোয়ান হোসেন বলেন, আমার বন্ধুরা ক্লাস করছে আর আমি শরীরে বুলেট নিয়ে কাতরাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা আমার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে, পরিবারের আর্থিক সচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে পোষাক শ্রমিকের কাজ করতেন নবী হোসেন (২০)। শত শত ছাত্রজনতা মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেন নি নবী হোসেন। গত ৪ আগস্ট গাজীপুরে ছাত্র জনতার আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। নিজের শরীরে কয়েক শত গুলি নিয়ে দেশের মানুষকে স্বৈরশাসন মুক্ত করার অংশীদারও হয়েছেন নবী হোসেন। কিন্তু বুলেটের আঘাতে পুরো শরীর ঝাজরা হয়ে যায়। বুলেটের যন্ত্রণায় বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন নবী হোসেন। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না পরিবার।
নবী হোসেন বারহাট্টার বাউসী ইউনিয়নের দেওপুর গ্রামের নসর জামালের ছেলে।
মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে ৪ আগস্টে বিভীষিকাময় অবস্থার বর্ণনায় নবী হোসেন বলেন, ছাত্রদের ওপর অন্যায়ভাবে গুলি করা হচ্ছে দেখে ঘরে থাকতে পারিনি। আমি তাদের আন্দোলনে অংশ নিই। গাজীপুরে আমরা জমায়েত হলে পুলিশ আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি করে। আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। তখন আট নয়জন পুলিশ আমাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে।
তিনি আরও বলেন, একজন পুলিশ আমার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে রক্ত বের করে ফেলে। আমি অচেতন হলে তারা আমাকে মৃত ভেবে একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখে। একপর্যায়ে আমার জ্ঞান ফিরে চিৎকার দিলে পথচারীরা আমাকে উদ্ধার করে জয়দেবপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তারা আমার চিকিৎসা না করে বিদায় করে দেয়।
নবী হোসেন আরও বলেন, আমার বড় ভাই জামাল হোসেন ঢাকা উত্তরা প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে দুদিন আইসিইউতে রাখে। দুদিনে মোটা অংকের বিল পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করলে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত আত্মীয়দের থেকে ধারদেনা করে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ করেছি।
ভাই জামাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার বলেন, বারহাট্টা হাসপাতালে নিলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু আমাদের আর সামর্থ্য নাই। বুঝতে পারছি না কী করব।
বারহাট্টা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রোগীর শরীরে অনেকগুলো রাবার বুলেট রয়েছে। এগুলো এখানে বের করা সম্ভব না। গুলি বের না করলে সে সুস্থ হবে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।