কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ৮ জন নিহতের ঘটনায় গত এক সপ্তাহে কুষ্টিয়া মডেল থানায় পৃথকভাবে নিহতদের পরিবার ও পুলিশের প্রায় অর্ধডজন মামলা হলেও মাত্র দুটি মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে রেকর্ড করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলির এজাহারে বাদীদের অভিযোগ- পুলিশ নিজেদের গা বাঁচিয়ে ঘটনার ভিত্তিহীন বিবরণ উল্লেখসহ ভিন্নখাতে নিয়ে ন্যায়বিচারে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তাদের অভিযোগ, আমাদের কাছ থেকে আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে পুলিশ নিজেদের মতো এজাহার লিখে আমাদের স্বাক্ষর নিয়েছে। তবে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে নাকচ করেছে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ।
ঘটনার বিবরণসহ কুষ্টিয়া মডেল থানায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রলুটের অভিযোগ এনে মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক এস এম আব্দুল আলীম বাদী হয়ে ৮-১০ হাজার অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। তাদের বিরুদ্ধে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান থানা ভবন লুট, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাসভবন, পুলিশ কোয়ার্টার, সদর সার্কেল কাম বাসভবনে অগ্নিসংযোগে সবকিছু ভস্মীভূতকরণ, পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করে গুরুতর জখম, সরকারি কাজে বাধা, নৈরাজ্য ও ত্রাস সৃষ্টি করে ৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতির কথা মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় সুনির্দিষ্ট বিবরণসহ হুকুমদাতা হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও মাহবুবুল আলম হানিফসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৭ পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১২৬ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ৪০/৫০ জনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতের বিচারক মাহমুদা সুলতানার আদালতে মামলা করেন নিহত বাবলু ফারাজির ছেলে সুজন মাহমুদ। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দিয়েছেন।
বাদী সুজনের অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট প্রতিদিনের মতো বাড়ি ফেরার পথে কুষ্টিয়ার ছয় রাস্তার মোড় এলাকায় পৌঁছলে সেখানে অবরোধ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে পড়েন বাবলু ফারাজি। এ সময় কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করছিল। আমার বাবা পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রাণ বাঁচাতে একটি গলির মধ্যে ঢুকে পড়েন। সেসময় মডেল থানার উপপুলিশের পরিদর্শক সাহেব আলী তাকে আন্দোলনকারী মনে করে গুলি করলে মাথার ডানপাশে লেগে বামপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে বাবলু ফারাজি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার দিন কুষ্টিয়া থানা ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মামলা করতে অপেক্ষা করি। পরে থানার কার্যক্রম শুরু হলে হত্যার অভিযোগে মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে বাবা হত্যার বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্ত হয়েছি। আমি আদালতে দেওয়া এজাহারে যা কিছু বলেছি তার সবকিছুর প্রমাণ ও ভিডিও রয়েছে।
এদিকে ৫ আগস্ট শহরের হরিপুরের বাসিন্দা মো. লুকমান হোসেন বাবুর্চির ছেলে আব্দুল্লাহ (১৩) পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, আমি পুত্রহত্যার বিবরণসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশের নাম এজাহারে দিলে ওসি সাহেব পুলিশের লেখা এজাহার নিয়ে আমার স্বাক্ষর করিয়ে নেন এবং মামলা রেকর্ড করেন।
কুষ্টিয়া আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আবু সাইদ বলেন, একই সময়ে একই স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণও হতে হবে অভিন্নরূপে। না হলে ভিত্তিহীন তথ্যের উল্লেখ করে দেওয়া এজাহারে যেসব মামলা রেকর্ড হবে সেসব মামালার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিচার প্রার্থীরা এসব মামলায় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেনকে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ কান্তি নাথ প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে জানান, ‘গত ৫ আগস্ট সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ ৭ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে করা মামলার বিষয়ে শুনেছি। বিস্তারিত এখনও কিছু জানি না। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে কুষ্টিয়া মডেল থানায় করা মামলার বাদী যেভাবে বলেছেন সেভাবেই মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। পুলিশের চাপিয়ে দেওয়া কোনও এজাহারে মামলা হয়েছে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন।’