লুটপাটে ব্যাংকের পরিচালকরা জেল খাটেন কর্মকর্তারা

ব্যাংকে যে লুটপাট হয়, সেখানে যারা বোর্ডে থাকেন বা ফোনে হুমকি দেন, নির্দেশ দিয়ে লুটপাট সম্পন্ন করেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের ধরা যায় না। কিন্তু জেল খাটেন ম্যানেজার বা ডিএমডি, যারা দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে হলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা।

তারা বলছেন, কোনো ব্যাংকের পরিচালক নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না এবং একই সঙ্গে অন্য কোনো ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না। পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার অতীত কাজের রেকর্ড ও অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্ব দিতে হবে। পরিচালনা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখতে হবে। নিরপেক্ষ, বিজ্ঞ ও দক্ষ লোকদের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সচেতন ব্যাংকার সমাজ আয়োজিত ‘ব্যাংক খাত সংস্কার : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এই আহ্বান জানান।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, যারা টাকা পাচার করেছে, তাদের আর দরকার নেই। ঘুষখোর, টাকা পাচারকারীদের আর দরকার নেই। যদি আইনের শাসন কার্যকর করা যায়, গণতান্ত্রিক মুক্ত পরিবেশ কার্যকর করা যায়, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। দেশের মানুষও বিনিয়োগ করবে। কথা বলার সময় এসেছে, যেখানে আছে সেখান থেকেই কথা বলতে হবে। রাস্তায় থেকে আওয়াজ তুললেও জায়গামতো পৌঁছে যাবে, ফল পাওয়া যাবে।

বিগত সরকারের সময়ে পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না উল্লেখ করে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শ্রীলঙ্কা পারেনি, পাকিস্তান পারেনি, ঘানা পারেনি, আমরাও পারব বলে আশা করতে পারি না। কারণ যেসব দেশে টাকা চলে যায়, সেসব দেশ টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে চায় না।

অনুষ্ঠানের সভাপতি এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, সরকারের কাছে দাবি তোলার জন্য রাস্তায় চিৎকার না করে লিখিত আকারে বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে দাবি জানাতে হবে। আজকের মুক্ত অবস্থার জন্য অনেকে জীবন দিলেন। কী পেলাম বা না পেলাম, এ নিয়ে যেন আক্ষেপ না করি। আমরা কথা বলার মতো একটি মুক্ত পরিবেশ পেয়েছি।

সাবেক অর্থ সচিব ইউনুসুর রহমান বলেন, সরকার ব্যাংকিং কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংক কমিশন করার সময় মামলা-মোকদ্দমা হবে। এজন্য যেন আইন করে উচ্চ আদালতে একটি ভিন্ন বেঞ্চ গঠন করা হয়। তা না হলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ২০১৭ সালে ব্যাংক কমিশন করার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের পর তা করা হবে। সে সময় যদি কমিশন করা হতো, তাহলে আওয়ামী শাসনের শেষ পাঁচ বছর যে লুটপাট হয়েছে, তা হতো না।

বিগত সরকারের সময়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না বলে উল্লেখ করেন সাবেক আরেক অর্থ সচিব এম আসলাম আলম বলেন, বেসিক ব্যাংকের অবস্থা নিরূপণের জন্য নিরপেক্ষ অডিট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে অডিট করিয়েছিলাম। অডিটে যে চিত্র উঠে এসেছিল, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে বলা হয়েছিল। কিন্তু অনুমতি পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠাতে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তখন বেসিক ব্যাংক লুটপাটের ব্যবস্থা নিলে পরে আর এ ধরনের লুটের ঘটনা ঘটত না।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকে যে লুটপাট হয়, সেখানে যারা বোর্ডে থাকেন বা ফোনে হুমকি দেন, নির্দেশ দিয়ে লুটপাট সম্পন্ন করেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের ধরা যায় না। কিন্তু জেল খাটেন ম্যানেজার বা ডিএমডি, যারা দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংক খাতের দুর্নীতি লুটপাট বন্ধ করতে হলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।