গোলাম মুরশিদ নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই গবেষণা বা গবেষক শব্দটি মনে আসে। তার রম্যরচনা এবং একটি উপন্যাস বাদ দিলে সবই গবেষণামূলক বা ধর্মী রচনা। গবেষণাকাজে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। মধুসূদনের খোঁজে তিনি ছুটে গেছেন যশোর থেকে কলকাতা, মাদ্রাজ থেকে লন্ডন, ভার্সাই থেকে এডিনবরায়। বিশ বছর ধরে মধুসূদনকে আবিষ্কারের জন্য পথে পথে ঘুরেছেন। মধুকবির জীবনীগ্রন্থ সংস্করণও করেছেন তিনবার। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি থেকে খুঁজে বের করেছিলেন মাইকেলের পরীক্ষার খাতা, এখানেই পেয়েছিলেন মধুসূদন সম্পর্কে তার শিক্ষকদের কয়েকটি চিঠি, প্রতিবেদন এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে খুঁজে বের করেছেন ফোর্ট উইলিয়াম-পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যের নমুনা। নজরুলের কী রোগ হয়েছিল, তা অনুসন্ধানের জন্য গিয়েছিলেন লন্ডনের সেন্ট্রাল মিডলসেক্স হসপিটালের কনসালট্যান্ট ডাক্তার মুহম্মদ নূরুল হকের কাছে। ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’ বইয়ের পরিশিষ্ট অংশে এই ডাক্তারের লেখাও জুড়ে দিয়েছেন। উনিশ শতকে বা বিশ শতকের প্রথমদিক পর্যন্ত নারীর অবস্থা ছিল জড় পদার্থসম। এই দশা থেকে দেড়শ বছরে নারী দেশের সরকারপ্রধান পর্যন্ত হয়েছেন। এই পরিবর্তনের কারণ কী, মেয়েরা নিজেরা কীভাবে এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পুরুষের প্রয়াসের প্রতি নারীদের মনোভাব কেমন ছিল, তা-ও গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন গোলাম মুরশিদ।
গবেষণার মাধ্যমে অনেক প্রচলিত ধারণার মূল উৎপাটন করেছিলেন গোলাম মুরশিদ। যেমন বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের যুগে এই প্রচলিত ধারণাকে সমূলে বদলে দিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন দুই হাজারেরও বেশি বাংলা বিজ্ঞপ্তি-বিজ্ঞাপন, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৮৪ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে। বাংলা সাহিত্যের গবেষকরা মনে করতেন ১৮১৮ সালের আগে যেহেতু বাংলা পত্রিকা প্রকাশ হয়নি, তাই বাংলা বিজ্ঞাপন সব এ সময়ের পরে হবে। তাই বাঙালি গবেষকরা আগের কোনো ইংরেজি পত্রিকার দিকে দৃষ্টি দেননি। গোলাম মুরশিদই প্রথম ‘Calcutta Gazatte’ নামক ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া ফরস্টারের তত্ত্বাবধানে ১৪টি আইনগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮০০ থেকে ১৮০৫ সালের মধ্যে। এ গ্রন্থগুলোর মধ্যে আটটি তালিকায় রয়েছে, অন্য ছয়টির কোনো তালিকা কোথাও নেই। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে গোলাম মুরশিদ এগুলো আবিষ্কার করেছেন। তিনি আরও আবিষ্কার করেছিলেন ১৭৫৬ থেকে ১৭৫৮ সালের মধ্যে কলকাতা মেয়র্স কোর্টে সম্পন্ন এবং দাখিল করা ২৬টি উইল, নালিশপত্র, নালিশের জবাব, কর্জপত্র ইত্যাদি। এগুলো সবই গদ্যে লেখা। তাছাড়া ‘ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বাংলা কাগজপত্র’ প্রবন্ধের বরাত দিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে নিয়ে লেখা সাড়ে তিন পৃষ্ঠার একটি গল্পের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এর সঙ্গে কিছু চিঠিপত্র এবং দলিলের কথাও বলেছেন। এ ছাড়া যারা উনিশ শতকের আগের বাংলা গদ্য সম্পর্কে লিখেছেন, তাদের রচনার কথাও উল্লেখ করেছেন। বৈষ্ণব ধর্মীয় সাহিত্য যে গদ্যে লেখা হয়েছিল, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছিলেন তার ‘ঔপনিবেশিক আমলের বাংলা গদ্য : উন্মেষ ও বিকাশের ইতিহাস’ গ্রন্থে। সব তথ্যপ্রমাণ সমেত তিনি পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন যে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই বাংলায় গদ্যের প্রচলন শুরু হয়েছিল। এমনকি গল্প পর্যন্ত!
বাংলার রেনেসাঁ নিয়েও নানা রকম ভ্রান্ত ধারণার ধূম্রজাল ছিন্ন করেছেন তিনি। দেখিয়েছেন ইতালি আর বাংলার রেনেসাঁর পার্থক্য একেবারে মূলগত। ইতালিতে হয়েছিল পুনর্জাগরণ আর এদিকে বাংলা মাত্র ঘুম থেকে জেগেছিল। কিন্তু জাগ্রত হয়েই রেনেসাঁর আঙিনায় পা ফেলেছিল বাংলা। প্রথম পর্যায়ে প্রাচীন শাস্ত্রে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেলেন রাজা রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রও। গোলাম মুরশিদ এদের সাহিত্যসহ তৎকালীন সমাজের ধর্ম, মানবতাবাদ, গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, ধর্মবিশ্বাসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সমাজ-সচলতা, ব্যক্তির
স্বীকৃতি : জীবনী, আত্মজীবনী, নারী-সচেতনতা, দেশীয় ভাষার শ্রীবৃদ্ধি, পৃষ্ঠপোষক ও শিল্পীদের সম্মিলন, সংগীত, নতুন স্থাপত্য, চিত্রকলা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করে রেনেসাঁর বিষয়ে ইতালির সঙ্গে বঙ্গের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
প্রশ্ন হলো, গোলাম মুরশিদ কি সাহিত্যের গবেষণার পাশাপাশি সমাজের একেবারে নির্মেদ বাস্তব জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন? হ্যাঁ, তাও করেছেন। ‘দেবতার নারীবন্দনা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘গরু দুধ দেয় বটে, কিন্তু তাহার শিং আছে। অনেক সময় সে মাথায় ঝাঁকুনি দিয়া গুঁতাইতে আসে। অনেক সময় দোহন করিবার সময় পা তুলিয়া ঝটকা লাথি মারে। কিন্তু মানুষের অর্থাৎ পুরুষের শত অত্যাচার সহ্য করিয়াও নারী কখনো গুঁতাইতে আসে না। অথবা লাথিও মারে না।’ এর পরের লাইনেই তিনি লিখেছেন, ‘প্রয়োজন মতো গুঁতাইলে তোমাদের দেহ ঝাঁঝরা হইয়া যাইতো। লাথি দিলে লাথি খাইতে খাইতে তোমাতের হাড় ভাঙিয়া গুঁড়া হইয়া যাইতো।’ এ কারণে তিনি নারীদের ‘গরুর চেয়ে উপকারী জন্তু’ বলে উল্লেখ করেছেন। এমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে নারীর অবস্থানকে আর কেউ চিহ্নিত করেছেন কি-না আমার জানা নেই। আবার রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘রোকেয়া দ্ব্যর্থহীনভাবে কেবল নারীদের উন্নতির কথা বলেননি, বরং নারীবাদের কথা উচ্চারণ করেছিলেন।’ গোলাম মুরশিদের এই সিদ্ধান্ত উনিশ এবং বিশ শতকের নারীদের ভূমিকা পর্যালোচনা ও গবেষণার ফল। তার বইয়ের নাম ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস’। তিনি খুব সচেতনভাবে ‘নির্দলীয়’ শব্দটি যুক্ত করেছেন। বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ইতিহাস বড় দুর্লভ, তাই তার এই শব্দ প্রয়োগ। ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন পর্যন্ত তিনি লিখেছেন। এতে বাঙালি জাতির ইতিহাস তুলে ধরেছেন নির্মেদভাবে। কাজে লাগিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা। তার বহুমুখী গবেষণায় নিবেদিত জীবনের মায়া কাটিয়ে ২২ আগস্ট তিনি চলে গেলেন। এই প্রথিতযশা গবেষকের প্রতি বিদায় শ্রদ্ধা জানাই।