প্রধানমন্ত্রিত্বের নির্দিষ্ট মেয়াদ

বাংলাদেশ এক অস্থির রাজনৈতিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের অভ্যুত্থান এবং গণহত্যার পর শেখ হাসিনার পলায়নে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। দীর্ঘ প্রায় ষোল বছরে এই সরকারের আমলে প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। অসীম লুটপাটের সঙ্গে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ভোট দেওয়ার অধিকার হয়েছিল ভূলুণ্ঠিত। স্বৈরাচার পতনের পর বাংলাদেশ নতুন আশায় স্বপ্ন দেখছে। যে স্বপ্ন নিয়ে ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে এই দেশ অর্জিত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন আবার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশকে একটি মুক্ত, গণতান্ত্রিক দেশে রূপান্তরের কৌশল নিয়ে সবাই ভাবছে। এর জন্য আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। আমরা বারবার দেখেছি, সংবিধানে জনগণের অধিকারকে কাচকলা দেখিয়েছে শাসকরা। কেউ কেউ নিজেকে দেশের মালিক ভাবতে শুরু করেছিল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই যেমন বলেছিলেন, আমিই রাষ্ট্র, অতীতে বাংলাদেশের শাসকদের কেউ কেউ তেমনি ভাবা শুরু করেছিলেন। যেই সংবিধান জনতার রক্ষাকবচ তাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে জনগণের অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। শাসকরা মনে করতেন তাদের ক্ষমতা অসীম, তাদের কেউ জবাবদিহি করতে পারবে না।

এই কারণে মুক্তিযুদ্ধের ২০ বছরের মাথাতেই জনগণকে আবার অভ্যুত্থান করে স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে হয়। জনপ্রিয় দলগুলো শপথ নেয় গণতন্ত্রের। কিন্তু, গত তিন দশকে ধীরে ধীরে সেই শপথ ভাঙতে থাকে। আবারও দেশের জনগণ একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে, এ জনপদের মানুষ যে ভাঙলেও মচকায় না, তীব্রভাবে ফিরে আসে নিজের অধিকারবোধ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে, তা আবার প্রমাণিত হলো। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অবস্থান আবারও সেই নব্বইয়ের মতোই। একদিকে গণতন্ত্রের হাতছানি অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আশঙ্কা। তবে, একটা ভালো দিক হলো, এই তিন দশকে আমরা ঠেকে শিখেছি যে, কোন কোন ক্ষমতাবলে শাসক স্বৈরাচার হয়ে ওঠে। ফলে, এখন সময় সেই সব রাস্তা বন্ধ করার। এর অন্যতম উপায় হচ্ছে কোনো একজন ব্যক্তিকে অসীম সময়ের জন্য ক্ষমতাশালী না করা। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতে পারে এর প্রথম ধাপ। এই সুপারিশ উঠে এসেছে বুধবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক আলোচনা সভায়। সেখানে বলা হয়, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই ব্যক্তি একসঙ্গে যেন সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী), দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা থাকতে না পারেন এবং একজন যেন দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্তভাবে সংসদ পরিচালনার জন্য স্পিকার যেন সংসদের অভিভাবক হিসেবে দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকেন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিহার করে সংসদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এসব সুপারিশও উঠে আসে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সব কার্যক্রমে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিহার করতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে জনবৈচিত্র্য; যেমন তরুণ, নারী, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ তরুণ প্রতিনিধি থাকতে হবে।

এরশাদ পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত হয়। কিন্তু এর পর থেকেই ক্ষমতাশালীরা এই ব্যবস্থা বাদ দিতে চায় অথবা নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিদের দিয়ে সরকার গড়ার চেষ্টা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের নির্বাচন অনেকের কাছে আদর্শ হলেও, বাংলাদেশে বড় দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস তা অসম্ভব করে তোলে। ফলে, আবার আমরা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেয়েছি। টিআইবির সুপারিশে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলনিরপেক্ষ নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করারও দাবি জানানো হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল করার জন্য সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।