দেশের চলমান পরিস্থিতিতে দুই মাস ধরেই ঘরবন্দি শিল্পীরা। মাহমুদুর রহমান হিমি পরিচালিত একটি নাটকের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই মাস পর দেশে শুটিংয়ে ফিরলেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ফারহান আহমেদ জোভান। কাজ, দেশের চলমান পরিস্থিতি ও সার্বিক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন ইমরুল নূর।
বন্যার্তদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
দুর্গত এলাকায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সবাই সেখানে ছুটে যাওয়ার চেয়ে তাদের সহযোগিতা এবং ত্রাণটাই এই মুহূর্তে বেশি প্রয়োজন। আমার একটা টিম ফেনীতে অবস্থান করছে। তাদের আমি প্রয়োজনীয় সব টাকা এবং জিনিসপত্র দিয়ে পাঠিয়েছি এবং তারা গিয়ে সেগুলো সেই মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আমি কোনো সংগঠন কিংবা কোনো ফাউন্ডেশনে টাকা দিইনি, কয়েকজন ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে একটা টিম করেছি, যেন আমি পুরো বিষয়টা টেককেয়ার করতে পারি। তারা খুবই অ্যাকটিভলি কাজগুলো করে যাচ্ছে। এখানে আমি ছাড়া আমার স্ত্রী, শাশুড়ি ও মা টাকা দিয়েছেন। আজকে যে নাটকের শুটিং করছি এর পারিশ্রমিকের একটা অংশ যাবে বন্যার্তদের জন্য। পরিচালক, শিল্পী, লাইটম্যান থেকে শুরু করে টিমের সবাই এতে এগিয়ে এসেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আপনার কী ভূমিকা ছিল?
আমি প্রত্যক্ষভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হতে পারিনি। কারণ ১৫ জুলাই দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলাম। দেশের বাইরে যাওয়ার পরই দেখি দেশের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তখন দেশেই নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফাইভজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও ফেসবুকে কোনো আপডেট জানতে পারছিলাম না। দু-একটা পোস্ট দেখছিলাম যারা ভিপিএন ব্যবহার করেছিল, তারা কিছু ছবি, ভিডিও প্রকাশ করছিল। যখন দেশের বাইরে গেছি তখন দেশের অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। এ কারণে আন্দোলনে সরাসরি থাকতে পারিনি। আবু সাঈদকে যখন হত্যা করে হয়েছিল, তখন ফেসবুকে একটা পোস্ট করেছিলাম। যেখানে লিখেছিলাম, এমন হত্যা দেখে চুপ করে থাকতে পারছি না। দাবি জানিয়েছিলাম, আর কাউকে হত্যা করা না হোক। কারও রক্ত না ঝরুক।
সে সময় অনেক শিল্পীকেই চুপ ছিলেন। আপনার মধ্যেও কি কোনো ভয় কাজ করছিল?
না। আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি। তবে দেশের বাইরে থাকার কারণে হয়তো সেভাবে কোনো হুমকি আসেনি। বিদেশ থেকে এক টানা পাঁচ দিন বাবা-মায়ের সঙ্গে বা অন্য কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারিনি ওইসময়।
নতুন দেশকে কীভাবে দেখতে চান?
আমি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে খুব পছন্দ করি। তিনি উচ্চশিক্ষিত এবং মার্জিত। চাই দেশটা ঘুরে দাঁড়াক। আমাদের দেশের অনেক ঋণ, অনেক অর্থ পাচার হয়ে গেছে। যদি তৎকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকত, আমরা তো এসব জানতে পারতাম না, যেগুলো এখন জানতে পারছি। আমি চাই অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় দিয়ে হলেও আমরা যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারি।
শোবিজের শিল্পীদের মধ্যে একটা বিভাজন দেখা গেছে এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
এই বিভাজনটা হয়েছে ক্ষমতার লোভে। যারা সরকারি দলের পক্ষে ছিল, তারা কখনো চিন্তাও করেনি যে তাদের পতন হবে। এ কারণেই বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এই বিভাজন নিয়ে কেউ জোর করে সমাধান করে দিতে পারবে না, যদি না কেউ নিজ থেকে চায়। যার যার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে একই জায়গায় থাকতে হবে। কিন্তু এটা জোর করে বা বলে সমাধান করা সম্ভব না। তখন এখানে আরও বিভেদ সৃষ্টি হবে।
শিল্পীদের রাজনীতি করাকীভাবে দেখেন?
এ বিষয় নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কলকাতা ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশ শিল্পীই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। উদাহরণ দেখার জন্য আমরা দূরে না দেখে কাছের দিকে নজর দিই। ভারত তো আমাদের পাশের দেশ, তাই সেখান থেকেই আমাদের দেশের শিল্পীরা উৎসাহী হতেও পারেন।
শোবিজের কি সংস্কার প্রয়োজন আছে?
শোবিজের তো অনেক কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকার পতনের পর দেখলাম শিল্পীরা শাহবাগে আন্দোলন করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মতে, বিষয়গুলো এভাবে বললে তো হবে না। তাহলে এমন দাঁড়ায়, রিকশাওয়ালাদের মতো দাবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়, আগে সুন্দর করে শিল্পীদের দাবিগুলো প্রস্তুত করে তারপর ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের কাছে পাঠাতে হবে। তার আগে অবশ্যই সরকারকে স্থিতিশীল হতে দিতে হবে। সবাই একসঙ্গে দাবি জানাতে থাকলে কিংবা এক দিনেই সব পরিবর্তন চাইলে তো হবে না। সাধারণ মানুষ আমাদের আইডল মানেন। তার জন্য আমাদের অবশ্যই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অন্যরা যেটা করছে, সেটা করলে তো হবে না।
বড় দাগে কোনো পরিবর্তন চান কি না?
এই মুহূর্তে শোবিজে আমি কোনো পরিবর্তন চাই না। যেভাবে যাচ্ছে আমার দিক থেকে ঠিক আছে কিন্তু আবার দেখা গেল আমার সহকর্মীর কাছে কোনো একটা বিষয় গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। তার হয়তো কিছু বলার আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার পক্ষ থেকে কিছু চাওয়ার নেই। আমি চাই সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হোক।
ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু এখন আর আগের মতো নেই। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেখানে অনেক প্রয়োজন নেই, সামনে অনেক ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তারা তৎকালীন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদি এমন কিছু হয়ে যায়, তাহলে তো এটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতি। তার মানে এই না যে নতুন মানুষ আসবে না! অবশ্যই নতুন মানুষ আসবে। নতুন প্রযোজক, পরিচালক তৈরি হবে। তাই আমার কাছে মনে হয় সময় দেওয়াটা জরুরি। তাড়াহুড়ো করলেই কোনো কিছুর সমাধান হয়ে যাবে না।