একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য কোনো রাষ্ট্র বানাতে পারিনি। আমার এই বয়ানের সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত করবেন। আর সেটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক দ্বিমতের বিপরীতে আমার বয়ান হচ্ছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যদি একটি ‘জনরাষ্ট্র’ বানাতে পারতাম তাহলে ‘পঁচাত্তর’, ‘নব্বই’ এবং সর্বশেষ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তথা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান’ কেন সংঘটিত হলো? আজকের গণ-অভ্যুত্থান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এর উত্তর খুঁজতে হলে, খানিকটা পেছনে ফিরতে হবে।
‘একাত্তর’ সংঘটনের পেছনে ছিল দুটো রাজনৈতিক তাড়না। একটি হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনতা মেনে অনুষ্ঠিত সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা না দেওয়া ও আরেকটি হচ্ছে নিপীড়ক রাষ্ট্র কাঠামো ছুড়ে ফেলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, অধার্মিক, অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণধর্মী জনরাষ্ট্র গঠনের জনআকাক্সক্ষা। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এমনিতর রাজনৈতিক জনসম্পৃক্ততার তোড়ে ওলট-পালট হয়ে যায় সব সমীকরণ। অনিবার্য হয়ে ওঠে মুক্তির লড়াই। যে লড়াই জন্ম দেবে একটি পৃথক জনসার্বভৌমত্বের, নির্মাণ করবে একটি জনরাষ্ট্র। এই ভূখন্ডের মানুষের নিজস্ব একটি জনরাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে অনিবার্য হয়ে ওঠা মুক্তির এই লড়াইয়ের পথ-পদ্ধতিতে বিরাজিত ছিল একেবারেই দুটো বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। একটি হচ্ছে, বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোতেই সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে দেশের মানুষকে শাসন করা এবং আরেকটি হচ্ছে সাধারণের মুক্তি তথা জনরাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা।
মুক্তির লড়াইটা জনযুদ্ধে রূপ নিলেও নেতৃত্বটা থেকে যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্টভোগী উঠতি বাঙালি ধনিক শ্রেণির হাতেই। উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেটি তখনো পূর্বাংশে গড়ে ওঠেনি। যে উঠতি ধনিক শ্রেণি তখন পাকিস্তানের মোট পুঁজির প্রায় ১১ শতাংশের মালিক বনে গেছেন। যে পুঁজি তখন চাইছে ‘ক্ষমতা’, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। তা সে যেভাবেই হোক না কেন! রাষ্ট্রের চরিত্রে অন্তর্ভুক্তিতার (ইনক্লুসিভনেস) বিষয়টি জায়গা পায়নি সচেতনভাবেই। উল্টো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, বাঙালি-অবাঙালি, খোদ রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকার ও প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী জায়গা করে নেয় ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার, লুটপাট আর অনৈতিকতার চূড়ান্তমাত্রা। সাংবিধানিকভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ রাষ্ট্রিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও এ দুটোর ন্যূনতম চর্চা ছিল না সরকার ও সমাজে। অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা সীমিত ছিল শহুরে নাগরিক সমাজে। এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর ব্যবহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা পায় ‘কর্র্তৃত্ববাদ’! এমনিতর কর্র্তৃত্ববাদী জনবিরুদ্ধ রাষ্ট্রনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনে রাষ্ট্রকে জনবিরুদ্ধতার শীর্ষে নিয়ে যায় সে সময়ের শাসক দল। পরিণতি ‘রক্তাক্ত পঁচাত্তর’! শাসনতান্ত্রিক বৈধতার নামে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করা হয় শাসনতন্ত্রকে। পদ্ধতিগত দিক থেকে দেশের বিদ্যমান ভোটব্যবস্থাকে করে ফেলা হয় অকার্যকর। সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আর্থ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ‘হাব’ হয়ে ওঠে গোটা দেশ। অনৈতিক ও নিয়মবহির্ভূত নানাবিধ রাষ্ট্রিক সুবিধায় ঋদ্ধ করা হয় সমাজের বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে। প্রথম দিকে অবশ্য সেনাশাসনকে সমর্থন করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের জনবিরুদ্ধতায় অতিষ্ঠ জনগণ। যে সমর্থন নিয়ে অনেকটা নির্বিঘœ শাসন পরিচালনা করেন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। কিন্তু জিয়া-পরবর্তী আরেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বিঘœ করতে পারেননি তার শাসন সময়। আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হলেও এরশাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নেওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটিই ছিল সাংবিধানিক। যাকে বলা যায় ‘অসাংবিধানিক আন্দোলনের সাংবিধানিক গর্ভপাত’। কেননা এই আন্দোলনের শুরুটা এবং একে তীব্রতর করার ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অগ্রগণ্য থাকলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় এর নেতৃত্ব চলে যায় অব্যবহিত আগের সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগের হাতে। সঙ্গে সহায়ক হিসেবে যুক্ত থাকে দেশের বামপন্থি দলগুলো।
দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথম ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয় তিন জোটের রূপরেখা। সরকার কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় পুনর্বহাল করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের করা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
গেল ১৫ বছর ধরে শাসনতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সব নীতিপদ্ধতিকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকার। রাষ্ট্র ও সরকারের সব স্তরে আর্থ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জারি রাখার লক্ষ্যে জনবিরুদ্ধতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় গোটা রাষ্ট্রনৈতিক কাঠামোকে। গুম, খুন আর ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে অকার্যকর করে ফেলা হয় মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে। ফলে আনুভূমিক এসব শক্তির পক্ষে ফ্যাসিস্ট এই শাসন ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা যায়নি কার্যকর কোনো আন্দোলন। কেননা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর শুধুই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া এসব বিরুদ্ধতায় আস্থা রাখতে পারেনি দেশের মানুষ। এমনিতর পরিস্থিতিতে আবারও জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ছাত্রসমাজ। প্রথমে এই আন্দোলন একান্তই ছাত্রদের বৈষয়িক দাবিতে সীমিত থাকলেও সরকারের সহিংস আচরণে তা পরিণত হয় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে। এতে খুব দ্রুততার সঙ্গে সাধারণ মানুষ শামিল হলেও শেষ পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত থাকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো। হাজারো মানুষের রক্তে সংঘটিত হয়েছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। অর্জন করেছি আরেক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে জন-অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে। সব বিভাজন পায়ে দলে বাংলাদেশ হবে সবার। নতুন সেই রাষ্ট্রটি পরিচালনা করবে দায় ও দায়িত্বের সরকার।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক
khoborjibi@gmail.com