খুলনায় ভবন নির্মাণে অনিয়মই যেন নিয়ম

সড়কের নালা ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে ছয়তলা ভবনের সামনের অংশ। উভয় পাশ ও পেছনেও ছাড়া হয়নি খালি জায়গা। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনটি গত পাঁচ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে নগরী খুলনার ৩১/১ বড় মির্জাপুর ইউসুফিয়া সড়কে।

শুধুই এ ভবনই নয়, ভবন নির্মাণে নিয়মে ব্যত্যয় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্রে ঘটছে অহরহ। ভবন নির্মাণে নিয়মনীতির তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে সীমিত। ফলে হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। বাড়ছে নানা ঝুঁকিও।

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) তথ্য অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান কেডিএ। আধুনিক খুলনা ও পরিকল্পিত নগরায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৬১ সালের ২১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। সংস্থাটির আয়তন এখন ৮২৪ বর্গকিলোমিটার। যার উত্তর সীমানার মধ্যে রয়েছে নওয়াপাড়া পৌরসভা, পূর্বে অভয়নগর, দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলা, দক্ষিণে মোংলা পোর্ট পৌরসভা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে বটিয়াঘাটা উপজেলা ও পশ্চিমে ডুমুরিয়া উপজেলার কৈয়াবাজার। এ অধিক্ষেত্রে সংস্থাটি তার অথরাইজড শাখার মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানাধীন, সরকারি, বেসরকারি দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন করে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়ন্ত্রণে অননুমোদিত ও খেলাপি নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করে।

কেডিএর ইমারত নির্মাণ বিধিতে উল্লেখ রয়েছে, ২ কাঠা জমির ক্ষেত্রে রাস্তার দিকে ৫ ফুট, উভয়পাশে ২ ফুট ৭ ইঞ্চি ও পেছনের দিকে ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি খালি জায়গা (সেটব্যাক) রাখতে হবে। ২ দশমিক শূন্য ১ থেকে ৩ কাঠা পর্যন্ত রাস্তার দিকে ৫ ফুট, উভয়পাশে ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি ও পেছনের দিকে ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি সেটব্যাক রাখতে হবে। ৩ দশমিক শূন্য ১ থেকে ৪ কাঠা পর্যন্ত রাস্তার দিকে ৫ ফুট, উভয়পাশে ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি ও পেছনের দিকে ৫ ফুট সেটব্যাক রাখতে হবে। ৪ দশমিক শূন্য কাঠা থেকে তদূর্ধ্ব পর্যন্ত রাস্তার দিকে ৫ ফুট, উভয়পাশে ৪ ফুট ১ ইঞ্চি এবং পেছনের দিকে ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি সেটব্যাক রাখতে হবে।

কিন্তু নগর ঘুরে দেখা গেছে, শত শত ভবন নির্মাণে সেটব্যাক অনুযায়ী জমি ছাড়ার নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ছয়তলা পর্যন্ত নকশা অনুমোদন নিয়ে সাততলাও করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৫ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ৭০ হাজার হোল্ডিং রয়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে।

কেডিএ জানায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত সাড়ে ১৫ বছরে খেলাপি নির্মাণের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৮টি নোটিস ও অননুমোদিত নির্মাণের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১৩৮টি নোটিস দিয়েছে তারা।

মহানগরীর বাসিন্দা মো. ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, সোনাডাঙ্গা প্রথম ফেজের ১২ নম্বর রোডের ২০১ বি প্লটে ভবন নির্মাণে প্ল্যান অনুমোদনে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। সেটব্যাক না মেনেই ভবন নির্মাণ হচ্ছে। উল্টো সড়কের ৫০০ বর্গফুট জায়গা দখল করা হয়েছে। তাছাড়া ছয়তলার নকশা অনুমোদন নিয়ে সাততলা করা হচ্ছে। অথচ অভিযোগ করা হলেও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শুধুই নোটিসে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রেখেছে।

এ ব্যাপারে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভবন নির্মাণে কেডিএর নিজস্ব আইন ও বিল্ডিং কোড আছে। ভবন নির্মাণ করতে গেলে কেডিএ থেকে নকশার অনুমোদন নিতে হয়। তবে অনুমোদন নেওয়ার পর আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

কেডিএকে দায়ী করে তিনি বলেন, অনুমোদন দেওয়ার পর অথরাইজড শাখা বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে তদারকি করে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিপুল অঙ্কের টাকার সুবিধা নিয়ে এ ধরনের কাজের সুয়োগ করে দেয়। এতে অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে। সড়ক সরু হয়ে যাচ্ছে। ফুটপাতে চলাচল করা যায় না। যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সড়কে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারে না। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন সড়ক প্রশস্ত ও নালা নির্মাণ করতে গেলেও স্থাপনাগুলো ভাঙার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে এসবের নেতিবাচক প্রভাব সুদূর প্রসারী।

জানতে চাইলে কেডিএর অথরাইজড অফিসার জি এম মাসুদুর রহমান বলেন, কেডিএর সীমানা অনেক বড়। এ সীমানায় তদারকি ও সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই। অবৈধ অংশ ভাঙতে নেই কোনো এক্সকাভেটর। হাতুড়ি ও ছোট যন্ত্রপাতি দিয়েই অবৈধ ভবন ভাঙা হয়। নানা সীমাবদ্ধতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।