ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। এখন পর্যন্ত তারা ফিরতে পারেনি ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যারা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে তারা চাচ্ছে না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ফিরুক। এরই মধ্যে বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগের পদধারী এবং বিভিন্ন সময় যারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছে তাদের ছবিসহ ব্যানার টাঙিয়েছে আবাসিক হলগুলোর বর্তমান শিক্ষার্থীরা। যেখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও অন্তত ১৫টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যাচমেট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ক্লাস-পরীক্ষা থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। অনেক বিভাগে আবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্লাস রুমে প্রবেশ করলে সেই ক্লাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করবে না। এছাড়াও কিছু দলীয় শিক্ষকদেরও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে শিক্ষার্থীরা। এসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অনেকের স্নাতক শেষ হয়েছে, কিন্তু স্নাতকোত্তর এখনো বাকি রয়েছে। আবার অনেকের স্নাতকই শেষ হয়নি। এতে শিক্ষাজীবন নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে দেখা যায়, সৈয়দ আমীর আলী হল, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক হল, শহীদ হবিবুর রহমান হলে ব্যানার টাঙিয়েছে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। সেখানে প্রায় অর্ধশতাধিক নেতার ছবিসহ দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী, সিট বাণিজ্য ও কোটা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫টি বিভাগের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যাচের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ক্লাসরুম, পরীক্ষা হলে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। এছাড়াও কিছু বিভাগে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্লাসে আসলে তারা ক্লাস করবে না এবং পরীক্ষা হলে ঢুকলে তারা পরীক্ষা দেবে না। এতে শিক্ষাজীবন নিয়ে সংশয়ে পড়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হয়েও যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, ছাত্রলীগের যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তাদের প্রতি ধিক্কার। তাদের প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবারই ক্ষোভ আছে এটাও সত্য। কিন্তু সবাই তো আর এই কর্মকাণ্ডে সঙ্গে ছিল না। যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছিল না তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বা শিক্ষাজীবন যদি হুমকির মুখে পড়ে তাহলে সেটা আরও বড় অপরাধ। শিক্ষার্থীরা এক সঙ্গে বসে ক্লাস করবে, পরীক্ষা দেবে যাতে ক্যাম্পাসের সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে। অন্যথায় আন্দোলনের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এদিকে আবাসিক হলগুলোতে ঢুকতে পারছে না আন্দোলনকারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। যারা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল তারা হল বা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারছে না। পাশাপাশি ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিল কিন্তু কোনো অপকর্মের সঙ্গে, শিক্ষার্থী নির্যাতনের সঙ্গে, সিট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিল না এমন কেউ আসলেও শিক্ষার্থীরা তাদের পাকড়াও করছে।
জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছাত্রলীগের এক নেতা তার জিনিসপত্র নিতে আসলে তাকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে এমনকি তাকে মারধরও করেছে শিক্ষার্থীরা। পরে হল প্রাধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের ওই নেতার কাছে লিখিতভাবে অঙ্গীকারনামা নেয়। পাশাপাশি তাকে রাজশাহী ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। সেদিনই ছাত্রলীগের ওই নেতা রাজশাহী ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। অথচ তার মাস্টার্স শেষ হয়নি এখনো।
এদিকে, ১৮ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে প্রশাসনের সিলগালা করা কক্ষের তালা ভেঙে প্রবেশ করার সময় আল আমিন নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ওই ছাত্রলীগ কর্মীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন তারা। পরে সেনাবাহিনী ডেকে তাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগ কর্মী আল আমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মমিনুল ইসলামের অনুসারী ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আল আমিন হলে থাকাকালীন আসন বাণিজ্য ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়াও সে কোটা আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন তথ্য ছাত্রলীগ নেতাদের সরবরাহ করেছেন। তবে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন ছাত্রলীগের ওই কর্মী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ছাত্রলীগের আগের কমিটির সময়ে টুকটাক রাজনীতি করে হলে উঠেছিলেন তিনি। মাত্র তিন মাস ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিলেন তিনি।
গত ১৯ তারিখ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ্ হল থেকে ছাত্রলীগের অস্ত্রভর্তি ট্রাংক হলের বাইরে অন্যত্র সরানোর অভিযোগে ছাত্রলীগের দু’জন কর্মীকে আটক করে গাছের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করেছে ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। তবে অভিযুক্তদের দাবি, ওই ট্রাংকটিতে আরেক ছাত্রলীগ কর্মীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছিল। অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কর্মীরা হলেন পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিফাত হাসান ও দর্শন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাকসুদ ভুঁইয়া। সিফাত হল শাখা ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মেশকাত হাসানের অনুসারী।
শিক্ষার্থীদের দাবি, যেসকল ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের তারা ধরেছে তারা সবাই সিট বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাই তাদেরকে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগ নেতা মোমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রকে সংস্কারের জন্য দলমত নির্বিশেষে মাঠে নামলাম, বিজয় অর্জন করলাম। কিন্তু এখন দেখি আমি হেরে গেছি। কারণ আমি ছাত্রলীগ করতাম। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন আন্দোলনে গেলাম, বাড়িতে এসেও এখানে আন্দোলন করলাম। কিন্তু এখন কি হচ্ছে। আমাদের তো মূল্য থাকলো না। যারা অন্যায় করেছে তাদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের কি দোষ? সামনে পরীক্ষা আছে। পড়ালেখা করতে হলে তো ক্যাম্পাসে যেতে হবে। বই-খাতা, শিট সব হলে আছে। এখন ভয়ে হলে যেতে পারছি না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেশকাত মিশু বলেন, শিক্ষার্থী হিসেবে আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে। শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে যেগুলো করছে সেগুলো খুবই অপ্রীতিকর। এটা নিয়ে আমরা খুবই অস্বস্তিতে আছি। এগুলো যেন না ঘটে সেটা আমরা চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পুলিশের মাধ্যমে উদ্ধার করে আমরা তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন তাদেরকে রক্ষা করাই আমাদের দায়িত্ব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ নেতাদের চিহ্নিত করে চিঠি দিয়েছিল যাতে তারা আন্দোলনকারীদের আঘাত না করে। ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর সকলের উচিত পূর্বের বিষয়গুলো ভুলে গিয়ে সবাই মিলেমিশে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। শিক্ষার্থীরা এক সঙ্গে ক্লাস করবে, পরীক্ষা দেবে যাতে ক্যাম্পাসের সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে। অন্যথায় আন্দোলনের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে যারা অন্যায়কারী অবশ্যই আইনের আওতায় এনে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, একজনকে গাছে বেধে রাখা এটা কোনোভাবেই উচিত নয়। ছাত্রলীগের যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তাদের প্রতি আমাদের ধিক্কার, তাদের প্রতি আমাদের ক্ষোভ আছে এটা সত্য। কিন্তু সবাই তো আর এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছিল না। অনেকেই ছিল তাদের প্রয়োজনে। একটা সিট পাওয়ার জন্য, হয়রানি না হওয়ার জন্য ইত্যাদি। কিন্তু ছাত্রলীগ করতো বলে তাকে অপদস্থ করতে হবে এটা অন্যায়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের এর থেকে বিরত থাকা উচিত। তাদেরকে ক্যাম্পাসে ফিরতে দেওয়া হবে না এই মনোভব থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। হ্যাঁ, সে যদি অন্যায় করে থাকে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে রাখো নতুন প্রশাসন আসলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। দরকার হয় আমি তখন শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকবো। তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য।