টিএসসিতে পর্দাঘেরা ‘ফিমেল জোন’, চলছে সমালোচনা

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্দা দিয়ে আলাদা ‘ফিমেল জোন’ চালু করাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ এটিকে পর্দানশীন শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ নতুন এই ‘ফিমেল জোন’ উদ্বোধন করেন। একই দিন টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের তালিকায়ও নতুন কিছু আইটেম যুক্ত করা হয়।

ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, অনেক নারী শিক্ষার্থী এমন একটি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় আগে থেকেই নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা রুম রয়েছে, যেখানে চাইলে হিজাব বা পর্দা বজায় রেখে খাওয়া যায়। টিএসসিতে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলেই একটি টেবিল পর্দা দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। তার দাবি, এতে কারও সমস্যার কারণ হওয়ার কথা নয়, তবে একটি পক্ষ বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছে।

তবে এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সাবেক শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে সমালোচনা করে সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তি) থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো উদ্যোগ। কারণ হিজাব-নিকাব পরা ও পর্দানশীন অনেক নারী শিক্ষার্থী এবং অন্য অনেক নারীও জনসমক্ষে বসে খেতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব সব ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বললেও টিএসসির দীর্ঘদিনের ওয়াশরুম সংকট সমাধানে ডাকসু তেমন উদ্যোগ নেয়নি। তার ভাষায়, ব্যবহার অনুপযোগী নারী ওয়াশরুম নিয়ে শিক্ষার্থীরা বহুদিন ধরে অভিযোগ জানিয়ে এলেও সেই সমস্যার সমাধানের চেয়ে পর্দাঘেরা বসার ব্যবস্থা করতেই বেশি আগ্রহ দেখা গেছে।

আব্দুল কাদের আরও লেখেন, ডাকসু শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট ঘরানার মানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে পর্দার ঘেরাটোপ, সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্দানশীন নারীরাও তো একইভাবে ওয়াশরুম সমস্যার শিকার। শুধু আলাদা বসার ব্যবস্থা করলেই নারীদের সব সমস্যা সমাধান হবে না। সৎ উদ্দেশ্য থাকলে সব ধরনের সমস্যার সমাধানে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পোস্টের শেষদিকে তিনি মন্তব্য করেন, ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’ হয়েছে, এটি ভালো; তবে এটি যেন ভবিষ্যতে কোনো ছাত্রসংগঠনের ‘ফিমেল উইংয়ের টিএসসি শাখা অফিসে’ পরিণত না হয়।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনও এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে হলে প্রথমে টিএসসির নারী ওয়াশরুমের অবস্থা উন্নত করা এবং স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তার অভিযোগ, এসব বাস্তব সমস্যা উপেক্ষা করে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা হচ্ছে।

টিএসসিতে উপস্থিত কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশের মতে, নারীদের জন্য আলাদা ঘেরাটোপ তৈরি না করে প্রয়োজন হলে একটি স্বতন্ত্র কক্ষ করা যেত। তারা মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থা নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বিভাজনের ধারণা তৈরি করছে।

তারা জানান, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও চলাচলের নানা সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টিএসসির নারী ওয়াশরুম ব্যবহার উপযোগী নয়। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বেশি জরুরি ছিল।

অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তাদের একজন বলেন, যারা পর্দা করেন, তারা অনেক সময় টিএসসিতে বসে খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এই ব্যবস্থা তাদের জন্য কিছুটা হলেও সুবিধা তৈরি করবে।

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলমও সামাজিক মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে লিখেছেন, একটি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়ায় আলাদা ‘ফিমেল জোন’ করার যৌক্তিকতা তার বোধগম্য নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য স্থানেও একই ধরনের বিভাজনের নজির তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’ চালুর উদ্যোগটি একদিকে কিছু নারী শিক্ষার্থীর কাছে স্বস্তির ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে নারী শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আদর্শিক ও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত