ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর
ভৌগোলিক অবস্থান, ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া বা জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে নিয়মিত বন্যা হয়ে থাকে। যেমন মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, বৃষ্টিপাতজনিত বন্যা ও উপকূলীয় বন্যা। বাংলাদেশের মানুষ বংশাণুক্রমে বন্যা এবং বন্যা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অভ্যস্ত। মানুষ রাত-দিন পরিশ্রম করে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। অতীতে বহুবার এর প্রমাণ করে দেখিয়েছে। ১৯৫৪ সাল থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এ দেশে কমবেশি ৩৫ বার মাঝারি থেকে বড় আকারের বন্যা হয়েছে। প্রতিবারই মানুষ সব ক্ষতি পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজন শুধু একটু পাশে দাঁড়ানোর একটু সাহস, আন্তরিক সহযোগিতা এবং সঠিক পরামর্শ নিয়ে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি কৃষক তার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনীতিবিদ। সে জানে যে তার অর্থনৈতিক-পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে পরিবার নিয়ে তাকে দুর্ভোগে পড়তে হবে। তাই কৃষকের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে আমাদের সেই আলোকে কাজ করতে হবে।
কৃষি এবং কৃষি প্রযুক্তিবিষয়ক সহায়তার জন্য বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষির ধরন শস্যবিন্যাস, সময় এবং উপকরণের প্রাপ্যতা সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এবারের বন্যায় ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রায় ৭৪টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষণের আগে কৃষির মৌসুম বিশেষ করে ধান চাষাবাদের মৌসুম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমরা জানি আউশ, আমন এবং বোরো ধানের তিনটি মৌসুম। আউশ মৌসুমে ধান বপন এবং রোপণ এই দুভাবেই চাষ করা যায়। রোপণের উপযুক্ত সময় ১০ চৈত্র থেকে ১০ বৈশাখ (২৪ মার্চ-২৩ এপ্রিল) এবং জাতভেদে কর্তনের সময় ২০ আষাঢ় থেকে ৩০ শ্রাবণ (৪ জুলাই-১৪ আগস্ট)। অন্যদিকে রোপা আউশের চারা জাতভেদে ১৫ চৈত্র থেকে ১৫ বৈশাখ (২৯ মার্চ-২৮ এপ্রিল) এর মধ্যে বীজতলায় তৈরি করে ২০-২৫ দিনের চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হয় এবং জাতভেদে কর্তনের সময় ১৫ শ্রাবণ থেকে ২০ ভাদ্র (৩০ জুলাই-৪ সেপ্টেম্বর)। সে হিসেবে বোনা এবং রোপা আউশ, এমনকি নাবি জাতের রোপা আউশও বন্যাক্রান্ত এলাকায় নষ্ট হয়ে গেছে। চলমান ফসল আমন এবং পরবর্তী ফসল বোরো। তাই আউশ নিয়ে আপাতত ভাবার কিছু নেই। ভাবনা হলো চলমান আমন এবং পরবর্তী বোরো মৌসুম নিয়ে। রোপা আমনের জাত নির্বাচনের আগে আলোক-সংবেদনশীলতা বিবেচনা করতে হবে। কারণ রোপা আমনের জাতগুলোর কোনোটা আলোক-সংবেদনশীল, কোনোটা স্বল্প আলোক-সংবেদনশীল আবার কোনোটাতে আলোক সংবেদনশীলতা নেই। এ বৈশিষ্ট্যের জন্য জাতভেদে বীজ বপন এবং রোপণ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আগানো বা পেছানো যায়। রোপা আমন মৌসুমের যেসব জাতের জীবনকাল ১৩৫ দিনের বেশি সে জাতগুলো ১৫ আষাঢ় থেকে ১৫ শ্রাবণ (৩০ জুন থেকে ৩০ জুলাই) পর্যন্ত বীজ বপন করে ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। সুতরাং ১৩৫ দিনের বেশি জীবনকাল সম্পন্ন জাতগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ নেই। আবার জীবনকাল ১৩৫ দিনের কম, কিন্তু ১২০ দিনের বেশি হলে সে জাতগুলো ২৫ আষাঢ়ের (৯ জুলাই) পর বীজ বপন করে ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। এই জাতগুলো নিয়েও পরিকল্পনা করার সুযোগ কম। কারণ বোরো মৌসুমকে বিবেচনায় রাখতে হবে। জীবনকাল ১২০ দিনের কম এমন জাতগুলো ১০ শ্রাবণের (২৫ জুলাই) পর বীজ বপন করে ২০-২৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করার পরামর্শ প্রদান করা হয়ে থাকে। ১২০ দিনের কম জীবনকাল এমন জাতগুলো হলোÑ ব্রি ধান৩৩ (ফলন : ৪.৫ টন/হে.), ব্রি ধান৫৬ (ফলন : ৪.৫ টন/হে.), ব্রি ধান৫৭ (ফলন : ৪.০ টন/হে.), ব্রি ধান৬২ (ফলন : ৪.৫ টন/হে.), ব্রি ধান৬৬ (ফলন : ৪.৫ টন/হে.), ব্রি ধান৭১ (ফলন : ৫.৫ টন/হে.), ব্রি ধান৭৫ (ফলন : ৫.৫ টন/হে.), ব্রি হাইব্রিড ধান৪ (ফলন : ৬.৫ টন/হে.) এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৬ (ফলন : ৬.৫ টন/হে.)। এই জাতগুলো আলোক-সংবেদনশীল নয়। তবে ব্রি ধান৫৬ ও ব্রি ধান৫৭ দুর্বল মাত্রায় আলোক সংবেদনশীল যার জীবনকাল বিনা ধান-৭ এর চেয়ে যথাক্রমে ৫ ও ১০ দিন এবং ব্রি ধান ৩৩-এর চেয়ে যথাক্রমে ১০ ও ১৫ দিন আগাম। এ দুটি জাত খরা সহনশীল এবং প্রজনন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০-১২ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। ব্রি ধান৭১-এর জীবনকাল ব্রি ধান৫৬-এর চেয়ে ৩-৫ দিন বেশি। দেরিতে রোপণের জন্য নাবি জাতের রোপা আমন ব্রি ধান২২, ব্রি ধান২৩, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৪৬, বিনাশাইল, নাইজারশাইল রোপণের উপযোগী। ব্রি ধান২২, ব্রি ধান২৩, ব্রি ধান৩৮ এবং ব্রি ধান৪৬ সম্পূর্ণ আলোক-সংবেদনশীল, জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন এবং ফলন ৪.০-৫.০ টন/হে.। এখন চারা তৈরি করা হলেও কর্তন করা যাবে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। এর ফলে বোরো আবাদ কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। যদিও আলোকসংবেদি জাত আশ্বিনের ১৫ (৩০ আগস্ট) তারিখ পর্যন্ত রোপণ চলে, তারপরও লক্ষ্য রাখতে হবে বোরো ধানের আবাদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দেরিতে নাবি জাতের আমন রোপণের ক্ষেত্রে ঘন করে রোপণ করতে হবে এবং প্রতি গোছায় চারার সংখ্যা বেশি দিতে হবে। তবে যেসব জমিতে নাবি আমন ধান চাষ করা সম্ভব হবে না এবং উফশী বোরো চাষ করা হবে সেসব জমিতে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য স্বল্প-মেয়াদি বারি সরিষা-১, বারি সরিষা-২, বারি সরিষা-৩, বারি সরিষা-১৪ এবং বিনা সরিষা-৯ চাষ করা যেতে পারে। অথবা বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বিনা চাষে আবাদযোগ্য মাষকলাই এবং খেসারি বপন করা যায়। আমার শৈশবে বন্যা-পরবর্তী জমিতে মাষকলাই, খেসারি এবং সরিষা চাষ করতে দেখেছি। কারণ কম খরচে এবং কম বিনিয়োগে এটি লাভজনক। যেসব জমি থেকে পানি নামতে দেরি হবে এবং বাড়ির সংলগ্ন জমিতে ভাসমান বেডে বিভিন্ন শাক, সবজি, এমনকি শিম চাষ করা যায় অথবা বিভিন্ন সবজির চারা তৈরি করা যেতে পারে। পানি সরে গেলে বেড মাটির যথাস্থানে বসিয়ে মাছা তৈরি করে দিতে হবে। যেসব জমি আলু চাষের উপযোগী সেসব জমিতে পানি সরে গেলে মালচিং করে আলু চাষ করা যেতে পারে। বাড়ির আঙ্গিনায় আগাম শীতকালীন সবজিও চাষ করা যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ধানের চারা তৈরির জন্য ট্রে পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। ট্রেতে উৎপাদিত ম্যাট টাইপ চারা রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের সাহায্যে দ্রুত রোপণ করা সম্ভব। প্লাস্টিকের রিজিড/ফ্লেক্সিবল ট্রে অথবা পলিথিনের ওপর ম্যাট টাইপ চারা তৈরি করতে হয়। ঝুরঝুরে দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি ম্যাট টাইপ চারা তৈরির জন্য উপযোগী। প্রয়োজন মতো জৈব সার মাটির সঙ্গে মিশ্রণ করা যেতে পারে। ট্রে অথবা পলিথিনের ওপর ২০ মিলি অথবা পৌনে এক ইঞ্চি গভীরতায় ঝুরঝুরে মাটি ছড়িয়ে দিতে হবে। ছড়িয়ে দেওয়া মাটির ওপর ধানের জাত এবং অঙ্কুুরোদগমের হার অনুযায়ী ১২০ থেকে ১৪০ গ্রাম পরিমাণ বীজ প্রতি ট্রেতে সমঘনত্বে ছিটিয়ে দিতে হবে। পলিথিনে বীজ বপনের ক্ষেত্রে ১.০ বর্গফুট জায়গায় ৭৫-৮০ গ্রাম বীজ বপণ করতে হবে। ট্রের ওপর বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার পর ঝুরঝুরে মাটি দ্বারা হালকা করে ঢেকে (৩-৫ মিলি গভীরতায়) দিতে হবে। তারপর ঝরনার মাধ্যমে হালকাভাবে সেচ দিতে হবে, যাতে ট্রের সম্পূর্ণ মাটি সিক্ত হয়। তবে ট্রে বাপলিথিনের ওপর কাদামাটির মাধ্যমে চারা তৈরির ক্ষেত্রে বপনকৃত বীজ মাটি দ্বারা ঢাকার প্রয়োজন নেই। আমন মৌসুমে শুকনা ঝুরঝুরে মাটি সংগ্রহ সমস্যা বিধায় মূল জমিতে কাদামাটি দিয়ে চারা উৎপাদন করাই শ্রেয়। কাদামাটির মাধ্যমে ট্রে বাপলিথিনের ওপর ম্যাট টাইপ চারা তৈরির জন্য প্রথমে সমতল এবং শক্ত ভূমিতে পলিথিন বিছাতে হবে বা ট্রে স্থাপন করতে হবে, পলিথিন বাট্রের ওপর এক ইঞ্চি গভীরতায় কাদামাটি ছড়াতে হবে অথবা পৌনে এক ইঞ্চি গভীরতায় শুকনো মাটি ছড়াতে হবে, সম-ঘনত্বে উল্লিখিত মাত্রায় বীজ বপন করতে হবে এবং বীজ বপনের ৭ দিন পর থেকে চারার গোড়া পর্যন্ত সেচ প্রয়োগ করতে হবে। চারা তৈরির জন্য ব্যবহৃত বীজ ধানের অঙ্কুরোদগমের হার ৯০ ভাগ বা আরও বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়। বীজ ধানের অঙ্কুুরোদগমের হার কম হলে আনুপাতিক হারে বীজের পরিমাণ বাড়াতে হবে। সমভাবে সেচ দেওয়ার জন্য প্লাস্টিাকের রিজিড/ফ্লেক্সিবল ট্রে অথবা পলিথিন সমান জায়গায় স্থাপন করতে হবে। মূল জমিতেই ট্রে অথবা পলিথিন স্থাপন করা উত্তম। চারার উচ্চতা, ঘনত্ব এবং ট্রে বাপলিথিনের ওপর মাটির পুরুত্ব যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রোপণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণের জন্য ২-৩ পাতা বিশিষ্ট ১২০-১৫০ মিমি উচ্চতার চারা, প্রতি বর্গ সেমিতে ৩-৪টি চারা এবং ট্রে/পলিথিনের ওপর ২.০-২.৫০ সেমি মাটির পুরুত্ব রাখলে রোপণের সময় কোনো মিসিং হয় না। উত্তম পরিচর্যা করা হলে ১৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করা সম্ভব। মেশিনে রোপণের ক্ষেত্রে চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৩-১৫ সেমির মধ্যে সেট করে যন্ত্র চালাতে হবে। কারণ সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি, যা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সর্বোপরি বন্যাক্রান্ত এলাকার জমি পতিত রাখা যাবে না। ধান চাষ করতে হবে এমন নয়। যেখানে যে ফসল চাষ করা সম্ভব তাই চাষ করতে হবে। উৎপাদন খরচ এবং ফলনের প্রতি যেমন লক্ষ্য রাখতে হবে, তেমনি আগামী বোরো যাতে কোনোভাবেই বিলম্বিত না হয় সেটিও বিবেচনায় রাখা। বোরোতে উচ্চ ফলনশীল অনেক জাত আছে। আগেই জাত নির্বাচনসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। পাশাপাশি সরকারিভাবে সার এবং নির্বিঘ্ন সেচের উদ্যোগ আগে থেকেই নিতে হবে।