লিটন কুমার দাস, এই নামটা বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এক অনন্ত আক্ষেপের নাম। প্রতিভা নিয়ে সংশয় নেই, তবে ঘাটতি থেকে যায় প্রয়োগে। তার বেশিরভাগ ইনিংসই বিজ্ঞাপনচিত্রের মতো, ঝকঝকে কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। চোখ ধাঁধানো সব শট খেলেন অনায়াসে, কিন্তু ইনিংসগুলোর অপমৃত্যু হয় অকালে। তবে রবিবার লিটন খেলেছেন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো। ঝকঝকে বিজ্ঞাপন নয়, রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার ইনিংসটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতো, যেখানে আবেগের উত্থান-পতন যেমন আছে তেমনি আছে অ্যাকশন আর গ্ল্যামারও। ২২৮ বলে ১৩৮ রানের ইনিংসটাকে লিটন নিজে তার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস মনে না করলেও গুরুত্বের বিচারে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সেরা নৈপুণ্যের এক অনন্য উদাহরণ।
বাংলাদেশের ইনিংসের ১১তম ওভারে ব্যাট করতে লিটন যখন মাঠে এলেন, তখন ২৬ রানে ৫ উইকেট নেই। অন্য প্রান্তে ছিলেন সাকিব আল হাসান, তিনিও দ্রুত বিদায় নিলেন। এরপর মেহেদি হাসান মিরাজের আগমন। প্রথম রানটা পেতে লিটন অপেক্ষা করেছেন ৮ বল, মুখোমুখি হওয়া ৯ম বলে খুররম শেহজাদকে ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারি মেরে লিটনের শুরু। শেষটা হয়েছে আগা সালমানের বলে মিড উইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দিয়ে। মাঝের সময়টা কখনো টিকে থাকার লড়াই, কখনো আগ্রাসী ভূমিকায় কখনো আবার রক্ষণশীল কৌশলে একপ্রান্ত আগলে রাখার। ২২৮ বলে ১৩৮ রানের ইনিংসে খুঁজে পাওয়া গেছে ব্যাটসম্যান লিটনের বিভিন্ন দিক, যেটা অনেকদিন ধরেই ছিল অদেখা।
‘শুরুতে আমি একটু স্নায়ুর চাপেই ভুগছিলাম, কারণ আমি ভাবিনি পানি পানের বিরতির আগেই আমাকে ব্যাট করতে নামতে হবে। আমার একটু নার্ভাসই লাগছিল। যখন আমি আর মিরাজ ব্যাটিং করছিলাম, আমরা শুধু একটা কথাই বলছিলাম যে ওদের (পাকিস্তান) সময়টা ভালো যাচ্ছে। আমরা সময় নিই, দেখি কী হয়’, সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজের ইনিংসের শুরুর সময়টার কথা এভাবেই জানিয়েছেন লিটন। ‘আমি কখনোই লম্বা কোনো পরিকল্পনা করিনি। আমি যখন সাকিব ভাইয়ের সঙ্গে শুরু করলাম, সাকিব ভাই খুব দ্রুত আউট হয়ে গেছে, আমি আর মিরাজ দুজনেই তখন উইকেটে নতুন। আমাদের ভেতর একটাই আলোচনা হচ্ছিল যে খেলাটা কতখানি লম্বা টানা যায়। কারণ তারা খুব ভালো বল করছিল, নতুন বলে বোলিং খুব ভালো হচ্ছিল। আমাদের আলাপের একটাই বিষয় ছিল যে ওদের এই ছন্দটা কীভাবে কাটাতে পারি। কৃতিত্ব মিরাজকে অবশ্যই দিতে হবে, আমার তো (বল) হাতে লাগার কারণে আমি খুব একটা শট খেলতে পারছিলাম না। তবে মিরাজ তার শট খেলে ওদের খানিকটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। আমার মনে হয় শুরুতে মিরাজের পাঁচ-ছয়টা বাউন্ডারি খেলায় আমাদের ছন্দে ফিরিয়েছে।’
কোণঠাসা অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু কিছু ওভারে বাংলাদেশ একাধিক বাউন্ডারিরও দেখা পেতে শুরু করে। সেই সময়টার কথা লিটন বললেন, ‘ খুররমের যে ওভারটা ছিল (৩১তম ওভার, লিটনের ৪ বাউন্ডারি সেই ওভারে) সেটা বোধহয় মধ্যবিরতির পর। বিরতির পর হওয়াতে একটু সতেজ হওয়ার সুযোগ ছিল আর আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকক্ষণ বোলিংয়ের পর তারাও খুব ক্লান্ত ছিল আর আমিও ঐ সুযোগটাই নিয়েছি। আমার জোনে বল ছিল, তাই আমি স্কোর করেছি’। মিরাজের সঙ্গে এভাবে ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন লিটন, কিন্তু মিরাজ আউট হওয়ার পর হাসান মাহমুদের সঙ্গে প্রায় ২ ঘণ্টার জুটিতে তাকে দেখা গেল অন্য ভূমিকায়, ‘হাসান যখন আসে তখন আমি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক মানসিকতায় চলে গিয়েছিলাম কারণ আমার বেলায় সব ফিল্ডারই বাইরে। আমার কোনো সুযোগই ছিল না ওখান থেকে বাউন্ডারি বা কোনো কিছু বের করার। হাসানকে কৃতিত্ব দিতেই হয় যে সে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে খেলানোর সুযোগ দিয়েছে। হাসানের সঙ্গে আমার যে আলাপটা হচ্ছিল যে যতক্ষণ আমরা উইকেটে থাকব, এক রান-দুই রান করে কিছু কিছু রান আগাবে। আর যতটা রান আগাবে তাদের লিডের পরিমাণটা তত কমবে। ঐ পরিকল্পনাতেই আমরা ব্যাট করছিলাম।’
সাবধানী, দায়িত্বশীল এবং প্রয়োজনে মারমুখী; একই ইনিংসে তার ব্যাটিংয়ের নানান রূপ। এটাই কি সেরা ইনিংস, এমন প্রশ্নে লিটনের উত্তর, ‘ না মনে হয়, আমি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৪১ রান করেছিলাম; আমার সঙ্গে প্রায় একই ব্যাপারগুলোই ঘটেছিল। আমার মনে হয় আমরা একটা ভালো সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছি আর আমি সুযোগটা পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবছি, আমি খুশি। আমি জানি আমরা পিছিয়ে আছি, তবে এটাই সুযোগ। কেউ যদি নিজেকে বড় খেলোয়াড় মনে করে, এটাই সুযোগটা কাজে লাগানোর সেরা সময়।’
অবিশ্বাস্য জুটিতে রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে জয়ের একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ। তবে জয় এখনো অনেক দূরে, তাই পা মাটিতেই রাখছেন লিটন, ‘আমরা যদি আগামীকাল (আজ) ভালো বোলিং করি তাহলে যে কোনো কিছুই হতে পারে। উইকেটে নতুন বলের জন্য সহায়তা আছে। আমরা যদি শুরুতে ব্রেক থ্রু আনতে পারি, একবার যদি ছন্দটা ফিরে পাই আমরা তাহলে আমাদের পক্ষে এই টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।’
মিরাজের সঙ্গে ১৬৫ রানের জুটির পর হাসান মাহমুদের সঙ্গে ৬৯ রানের জুটি, লিটন যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন ব্যাট হাতে, তার ব্যাটিংয়ে এই পরিণতবোধেরই ছিল অভাব। তাই তো লিটনের ইনিংসগুলো হয়ে থাকত আক্ষেপের অপর নাম। তবে রাওয়ালপিন্ডির ইনিংসটা জানান দিল, লিটনের ব্যাটিং শুধু আক্ষেপ নয়, পরিতৃপ্তিও উপহার দেয়। যার ফলটা উপভোগ করে গোটা দল।