বিবিসির প্রতিবেদন

ভারতে শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক নিয়ে দিল্লির চ্যালেঞ্জ

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। এতোদিন ভারতের দিল্লিতেই অবস্থান করছেন তিনি।  

প্রাথমিকভাবে শেখ হাসিনা অল্প সময়ের জন্য ভারতে থাকবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। সে সময় অনেক গণমাধ্যমে বলা হয়েছে যে, তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু এখনও তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

তবে ভারতে শেখ হাসিনার অব্যাহত অবস্থান বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিল্লির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

বিবিসি বলছে, ভারতের কাছে বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, কৌশলগত অংশীদার এবং ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর, ভারতের সাথে বেশ কয়েকটি সীমান্ত বিরোধ বন্ধুত্বপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করেছেন। তার ১৫ বছরের শাসনামলে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং সংযোগের বিকাশ ঘটে। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারত সড়ক, নদী এবং ট্রেন চলাচলের সুযোগ পেয়েছে।

তাই শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক ধরে রাখাটা ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জের বলছে বিবিসি।

সীমান্ত নিরাপত্তা সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথে আর্থিক সম্পর্কও রয়েছে বাংলাদেশের। ২০১০ সাল থেকে, ভারত অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশকে ৭০০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে। শেখ হাসিনার আকস্মিক প্রস্থান মানে দিল্লিকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে যাতে এই অর্থ নষ্ট না হয়।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, এটি এই অর্থে একটি ধাক্কা যে আমাদের আশেপাশে যেকোন অশান্তি সবসময়ই অবাঞ্ছিত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথেই কাজ করবে কারণ এর কোন বিকল্প নেই এবং তারা অভ্যন্তরীণভাবে যা করবে তা আপনি নির্ধারণ করতে পারবেন না।

তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে শুভেচ্ছা পৌঁছাতে ভারত সরকার কোন সময় নষ্ট করেনি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শপথের পরই টেলিফোনে আলাপচারিতা সেরেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

যদিও বোঝা যাচ্ছে, গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি অটল সমর্থনের জন্য বাংলাদেশিদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ভারতের কিছুটা সময় লাগবে।

ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "ভারতের জন্য তার আঞ্চলিক নীতি সম্পর্কে কিছু আত্মদর্শন করার সময় এসেছে।"

তিনি বলেন, ‘দিল্লিকে দেখতে হবে যে এটি তার আঞ্চলিক অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে গ্রহণ করেছে কিনা।‘

"আমি শুধু বাংলাদেশের কথাই বলছি না, এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশের কথাই বলছি, বলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের অন্যান্য সরকারগুলোও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সাথে, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাথে যুক্ত হতে ব্যর্থ হয়েছে৷

বিবিসি বলছে, ২০০১ সাতল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময়, ভারতের উত্তর-পূর্ব থেকে বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দিল্লির সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আর তাই আগামী দিনে দিল্লি ও বিএনপি নেতাদের নিজেদের মতভেদ কাটিয়ে কাজ করার পথ খুঁজতে হবে।

আর তাই বিএনপি নেতারা বলছেন যে, "এখন দিল্লির পক্ষ থেকে নীতি পরিবর্তনের সময়"।

বিবিসি বলছে, ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশিদের ক্ষোভের পেছনে অন্য কারণও রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ ৫৪টি নদী ভাগ এবং জলসম্পদ ভাগাভাগি একটি বিতর্কিত বিষয়।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আকস্মিক প্রবল বর্ষণের পরে, অতিরিক্ত পানি গোমতী নদীতে প্রবাহিত হয়েছে, যার কারণে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছিল। বন্যায় লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেকে তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও কৃষিজমি হারিয়েছে। এই বন্যায় অনেকের অভিযোগ ছিল যে রাতে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রিপুরার ডম্বুর বাঁধ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বন্যা হয়েছে।   

যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ অস্বীকার করে একটি বিবৃতি জারি করেছিল। তাঁরা ব্যাখ্যা করেছিল যে গুমতি নদীর এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হয়েছিল।

বিবিসি বলছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল চীন। ভারতের সাথে আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে বেইজিং বাংলাদেশে পদচিহ্ন প্রসারিত করতে আগ্রহী। 

আর তাই দিল্লিতে শেখ হাসিনার অবস্থানকে ঘিরে সাবধানে পদক্ষেপ ফেলতে হবে বলছে বিবিসি, বিশেষ করে যদি বাংলাদেশের নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ করে।

কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগ করতে বলবে না যেখানে তার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পরতে পারে। এছাড়া একজন শক্তিশালী সাবেক মিত্রকেও হারাতে চাইবে না তাঁরা।