এ ভূখণ্ডের মানুষের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতারা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে সামরিক স্বৈরাচার ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত ও জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ আমলে এরশাদকে গণ-অভ্যুত্থানে উচ্ছেদ করা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের দেখা মেলেনি। উপরন্তু শেখ হাসিনার বেসামরিক স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে স্বল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের আত্মদানে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকারের পতন ঘটেছে। যে গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে এই বিশাল গণ-আন্দোলন, তার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের নানামুখী সংস্কার প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ। আমাদের দেশে জনপ্রতিনিধি হয় দুই ধরনের : জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের। এ দুয়ের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার যথার্থ বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন, একটিকে আরেকটির মুখাপেক্ষী করা চলবে না। জাতীয় সংসদ সদস্যরা হলেন আইনপ্রণেতা। অর্থাৎ তারা নীতিনির্ধারক। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংশোধন, শিক্ষানীতি, শিল্প নীতি, কৃষি নীতি, পররাষ্ট্র নীতি ইত্যাদি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি করবেন। অমুকের বাড়ি থেকে তমুকের গোয়াল পর্যন্ত রাস্তা পাকা হবে কিনা এগুলোর দায়িত্ব সরাসরি স্থানীয় সরকারকে দিয়ে দিতে হবে। সংসদ নির্বাচনের প্রচলিত পদ্ধতি বদলে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নয়, নীতি নির্বাচিত হবে। জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিরা কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব না করে প্রতিনিধিত্ব করবেন পুরো দেশের।
বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রথমত, একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় First past the post system. নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যে ব্যবস্থাটি প্রচলিত তা হলো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বা Proportional representation system. এই পদ্ধতিতে একটি দল যে পরিমাণ ভোট পাবে সেই অনুপাতের ভিত্তিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ হবে। অনেক দেশে এই দুটি পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে প্রতিটি দল নির্দিষ্ট সংখ্যক আসনের জন্য একটি তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেবে। সেই তালিকা অনেক দেশে প্রকাশ করা হয়, অনেক দেশে আবার গোপন রাখা হয়। ভোটাররা নির্দিষ্ট ব্যালটে প্রার্থীর পরিবর্তে দল বা দলীয় প্রতীকে ভোট দেবে। তখন সারা দেশের ভোট গণনা করা হবে। প্রত্যেক দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
ভোটের হিসাবে প্রধান দুই দলের মধ্যে তেমন পার্থক্য না থাকলেও সংসদে আসন সংখ্যায় ব্যাপক পার্থক্য হওয়ার কারণে ক্ষমতা কাঠামোতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। কিন্তু সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনে সেটি হবে না। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভোটের চেহারা কেমন হবে তা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এটি বলাই যায়, আদর্শভিত্তিক ছোট দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তারা বড় দলগুলোকে চাপ দিতে পারবে। সে ক্ষেত্রে জোট হবে নির্বাচনের পরে আর বড় দলগুলো ছোটদের শর্ত মেনেই সে পথে হাঁটবে।
প্রচলিত ব্যবস্থায় ধরা যাক, কোনো আসনে একটি দল ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হলো। অপর দুটি আসনে যথাক্রমে ২০ ও ১০ শতাংশ করে ভোট পেল। এতে তার প্রাপ্ত ভোট ২০ শতাংশ। কিন্তু সংসদে দলটির কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকল না। এ ব্যবস্থার চরম অসঙ্গতি ফুটে ওঠে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০১-এর ফলাফল বিশ্লেষণে। নির্বাচনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪০.৯৭% এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪০.১৩%। অথচ দল দুটির সংসদে আসন ছিল যথাক্রমে ১৯৩ ও ৬২। অর্থাৎ সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছিল বিএনপির ৬৪.৩৩%, আওয়ামী লীগের ২০.৬৬%। এর বিপরীতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু থাকলে দলগুলো তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোনীত ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেবে, কর্মসূচি বা ইশতেহার জনগণের মধ্যে প্রচার করবে। দলের নাম ও প্রতীক সংবলিত ব্যালটে জনগণ ভোট দেবে।
প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন সংখ্যা নির্ধারিত হবে। যেমন : কোন দলের প্রাপ্ত ভোট মোট ভোটের ৫% হলে তার জন্য নির্ধারিত হবে ১৫টি আসন। সে ক্ষেত্রে তার প্রেরিত তালিকার প্রথম ১৫ জনকে নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্য ঘোষণা করবেন। এ ব্যবস্থায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রচলিত ব্যবস্থায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একটি দলের ইচ্ছামাফিক সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালু থাকলে এক দলের ইচ্ছাতে সংবিধান সংশোধন করতে চাইলে প্রায় ৬৭% ভোট পেতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। ফলে কোনো একটি দল এককভাবে সংসদ নিয়ন্ত্রণ করা বা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠা নিয়ন্ত্রিত হবে। তবে কী সংবিধান সংশোধন করা যাবে না? নিশ্চয় যাবে, সে ক্ষেত্রে সংশোধনীটি অন্য এক বা একাধিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। কোয়ালিশন সরকারও গঠিত হতে পারে। কোয়ালিশন হোক বা না হোক, কম আসন নিয়ে সংসদে থাকা দলটিও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারবে না।
বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু এর আগে যখন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতো, তখনকার প্রচলিত পদ্ধতিতে আমরা দেখি নির্বাচনে অনেক টাকার মালিকরা ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর মনোনয়ন নিয়ে থাকে। সে মনোনয়ন নিয়েও বাণিজ্য হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এরপর এরা নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় মাস্তান ভাড়া করে ত্রাস সৃষ্টি করে। বিশেষত সংশ্লিষ্ট এলাকায় ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ে সংখ্যালঘু থাকলে, বড় ভুক্তভোগী হয় তারা। প্রার্থীদের অনেকেই গণমাধ্যমের মালিক হওয়ায় নিজের প্রচার করিয়ে নিতে পারে অথবা গণমাধ্যমকে টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে প্রচার করিয়ে নিতে পারে। নির্বাচনকালে বা আগেই বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, মহড়া এগুলো দিয়ে নিজেদের প্রচারের আলোয় রাখার চেষ্টা করে। এর সঙ্গে আছে টাকা দিয়ে ভোট কেনার চিরাচরিত প্রথা। এ প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এটি চলমান থাকলে কম সম্পদশালী বা দরিদ্র প্রার্থীরা কখনো সমান প্রচারে আসতে পারবেন না। ফলে এই অসাম্যের সুযোগ নিতে পারেন ধনী প্রার্থীরা। অথচ এফবিসিসিআইর সভাপতির যেমন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার আছে, তেমনি ন্যূনতম ১২০০০ টাকা মজুরিতে কাজ করা গার্মেন্টস শ্রমিকেরও প্রার্থী হওয়ার অধিকার রয়েছে। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কোনো তরুণ হয়তো মানুষের মুক্তির সংগ্রামের দায়িত্ব নিতে অন্য পেশা না নিয়ে রাজনীতিই করছেন, দলের সমর্থক ও বন্ধুবান্ধবদের দেওয়া ডোনেশনই যার জীবন ধারণের অবলম্বন।
জ্ঞান-প্রজ্ঞা, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ বা রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞায় যিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভীষণ উপযুক্ত। এ ধরনের মানুষেরা ওই এফবিসিসিআই বা বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ নেতার বিরুদ্ধে প্রার্থী হলে কখনোই জিততে পারবেন না। কারণ ওই টাকার বন্যায় একজনের প্রচার হবে, অপরজনের প্রার্থিতার খবরও কেউ জানবে না। কিন্তু সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় যেহেতু বিশেষ এলাকার সব ভোট পেলেও কোনো বিশেষ প্রার্থী সংসদ সদস্য হতে পারবেন কিনা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই বিশেষ কোনো অঞ্চলে টাকা ছড়ানোর প্রবণতা ভীষণভাবে কমে আসবে।
গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষায় জনগণের বিপুল আত্মত্যাগে তৈরি হওয়া সংস্কারের সুযোগে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও অর্থবহ করতে টাকা, ধর্মীয় প্রচারণা ও আঞ্চলিকতার প্রভাবমুক্ত জনমতের প্রতিনিধিত্বশীল এবং বহু মতের সম্মিলিত সংসদ প্রতিষ্ঠায় সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন হতে পারে যথার্থ বিকল্প।
লেখক: প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ ভোলা সরকারি কলেজ, ভোলা