গাজার ১৫ বছর বয়সী কিশোর ইউসেফ সাদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যাকাটির আর দশজন কিশোরের মতোই কাটার কথা তার সময়। কিন্তু ইউসেফ সাদ অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার মুখে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলার মধ্যেই সমবয়সীদের চেয়ে নিজেকে আলাদাভাবে তৈরি করেছে সে। কৈশরের দুরন্তপনায় লাগাম পরিয়ে হাতে তুলে নিয়েছে আরবি সংস্কৃতির জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র ওদ। সাদের হাতে সেই যন্ত্রে উঠছে নানা ধরনের সুর। শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনছে ওদের তারে ওঠা সংগীত। কিছু সময়ের জন্য হলেও বিস্ফোরণ, গোলাগুলি আর আর্তনাদের বিভীষিকা ভুলে স্বস্তি পাচ্ছে তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গাজার এই ‘সংগীত বালকের’ ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোগ। রয়টার্স বলছে, যে বয়সে হেসে-খেলে দিন কাটানোর কথা সেই বয়সে অন্যের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় কিশোর ইউসেফ সাদ। প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ওদ-এর মোহনীয় সুর দিয়ে গাজার স্বজন হারানো শিশুদের মন ভুলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। প্রায় ১১ মাস ধরে চলা আগ্রাসনের যে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে গাজা উপত্যকার শিশুদের ওপর তা কাটানোর চেষ্টায় তৎপর কিশোর ইউসেফ সাদ। তাই ইসরায়েলের বিমান হামলা ও বোমা বিস্ফোরণের ক্রমাগত ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে ঢাকা পড়া রাস্তা পেরিয়ে প্রতিদিন সাইকেলে উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে গিয়ে গান শোনায় শিশুদের। এ ছাড়া শিশুদের ওদ বাজানো শেখায়ও সে।
মাথা গোজার ঠাঁই আর পরিবার-পরিজন হারালেও শোকের কাছে হারেনি এই খুদে বাদক। তাই তো কিশোর ইউসেফ সাদ নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপে বসে প্রিয় ওদ-এ মোহনীয় সুর তুলে আতঙ্কিত শোকাহত শিশুদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউসেফ সাদ রয়টার্সকে বলে, ‘গাজার প্রতিটি ঘরেই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। কেউ মা, কেউ বাবা, কেউ প্রতিবেশী অথবা কেউ বন্ধু হারিয়েছে। আর আমার এই শহরের বাড়িগুলো একসময় স্বপ্নে ভরপুর ছিল। এখন সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’
ইউসেফ সাদ গাজা সিটির কাছে অবস্থিত এডওয়ার্ড সাইদ ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব ইনস্টিটিউটে মিউজিকে পড়াশোনা করত। তার স্বপ্ন ছিল একদিন বিশ্বের নামকরা বাদ্যশিল্পী হবে। খুদে এ বাদকের বাবা ফিলিস্তিনের সরকারি কর্মকর্তা। তিনি সাদের বাদ্যশিল্পী হওয়ার স্বপ্নকে সবসময় সমর্থন দিয়েছেন। তবে এখন সাদের মনোযোগ অন্যদিকে। এখন যুদ্ধে আতঙ্কগ্রস্ত শিশুদের জন্য কিছু করায় তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা থেকেও পিছপা হবে না সাদ। তার কথায়, ‘আমরা ফিলিস্তিনি শিশুদের গণহত্যার মুখে দাঁড়িয়ে শক্ত ও প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করব। আমরা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এমনকি আমার নিজের জীবনকে ঝুঁকির ঠেলে দিতে সবসময় প্রস্তুত।’