এক বছরে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে ৭ লাখ ৮০ হাজার

দেশের বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি শ্রমশক্তিকে দেশের মোট জনশক্তির অংশগ্রহণও কমেছে। চলতি বছরের জুন শেষে বাংলাদেশে শ্রমশক্তি কমেছে ৯ লাখ ৩০ হাজার, এর মধ্যে নারীই রয়েছেন প্রায় ৮ লাখ। 

শ্রমশক্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন শেষে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৩ সালের জুনে নারীদের এমন সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে ৭ লাখ ৮০ হাজার।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই বছর নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়া দূরে থাক, বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতেই চলছে অচলাবস্থা। দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ের বিশাল অংশ নারী। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাবে এ উদ্যোক্তারা মাঝপথে থেমে যান। এরমধ্যে গত এক বছরে ব্যাংক খাতে অস্থিরতার জেরে বিনিয়োগ কম পেয়েছেন ছোট উদ্যোক্তারা।

এছাড়া দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া উচ্চ সুদহারের নীতির কারণে বিপাকে পড়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। ব্যাংকঋণ না পেয়ে অনেকেই কাজ হারিয়েছেন অথবা ব্যবসা ছোট করেছেন। ফলে কমেছে কর্মসংস্থান, প্রভাব পড়েছে দেশের মোট শ্রমশক্তিতে।

অর্থনীতির দুরবস্থার কারণে বেকারত্বের হারও বেড়ে গেছে। দেশের বেকারত্বের হার এখন ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ, গত বছরের একই সময়ে বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।

শ্রমশক্তি বলতে বোঝায় ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী কর্মে নিয়োজিত এবং বেকার জনগোষ্ঠীর সমষ্টি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, জুন মাস শেষে দেশের শ্রমশক্তি দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজারে, যা এক বছর আগেও ছিল ৭ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানেই কমেছে ৯ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে নারীই সবচেয়ে বেশি, ৭ লাখ ৮০ হাজার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও জেন্ডার-সম্পর্কিত সামাজিক প্রথাগুলোর ভিত্তিতে নারীদের জন্য কিছু গ্রহণযোগ্য পেশা রয়েছে। তৈরি পোশাক শ্রমিক ছাড়া নার্স, বিউটি পারলার কর্মী, গৃহকর্মী, গৃহভিত্তিক দরজি ও গৃহভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মতো হাতেগোনা কিছু পেশাকেই মূলত শহরের নারীরা বেছে নেন।

এসব পেশার অধিকাংশই খন্ডকালীন ও অনিয়মিত প্রকৃতির, যেখানে কাজের চাহিদা যেমন কম, কাজ হারানোর ঝুঁকিও তেমন বেশি। লিঙ্গভিত্তিক পেশাগত এই বিভাজনের ফলে তাই শহরের শ্রমবাজারে নারীরা একদিকে যেমন বিভিন্ন পেশা বেছে নিতে পারেন না, তেমনি একটি নির্দিষ্ট পেশায় বিপুল সংখ্যায় নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অঞ্চলের নারীরা অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন। তারা বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছেন, আবার যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগ, সম্পদের মালিকানা এসব ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মানদন্ড অনুযায়ী শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি মেলানো যায় না। সমাজের গভীরে প্রোথিত রীতিনীতির কারণে নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন, বিশেষ করে পরিবারের শ্রমের বিভাজন এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে শ্রমশক্তির ২৬ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বেকার ছিলেন। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার বেশি। কাজে নেই এমন তরুণদের সংখ্যাও এ সময় বেড়েছে। জুন শেষে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জুন মাসের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ওই জরিপের প্রতিবেদন সদ্য প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে, বেকার জনগোষ্ঠী মূলত তারাই, যারা বিগত সাত দিনে এক ঘণ্টাও কোনো কাজ করেননি কিন্তু কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং বিগত ৩০ দিনে বেতন বা মজুরি অথবা মুনাফার বিনিময়ে কোনো না কোনো কাজ খুঁজেছেন।