দাবার সর্বোচ্চ আসর ফিদে অলিম্পিয়াড। যেখানে নিয়মিতই অংশ নেয় বাংলাদেশ। অতীতের মতো এবারও অলিম্পিয়াডের ওপেন ও মহিলা বিভাগে অংশ নেবে বাংলাদেশের ১০ দাবাড়ু। যে দলে থাকার কথা ছিল দেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের। তবে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে খেলতেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন এই তারকা। তার অকাল মৃত্যুতে খেলার সুযোগ চলে আসে ছেলে তাহসিন তাজওয়ার জিয়ার। প্লে-অফ উতরে ঠিকই অলিম্পিয়াগামী দলে জায়গা হয়েছে তাহসিনের। তবে জিয়ার শূন্যতা থেকেই গেছে। মহিলা বিভাগে ৮২ বছর বয়সী আন্তর্জাতিক মাস্টার রানী হামিদের হাঙ্গেরি যাওয়া বড় খবর। আবার সঙ্গী হিসেবে এই কিংবদন্তি পাচ্ছেন দুই বোন ওয়ালিজা আহমেদ ও ওয়াদিফা আহমেদকে। ১০ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর বুদাপেস্টে বসবে বিশ্ব দাবার শীর্ষ আসর।
ওপেন বিভাগে বাংলাদেশ দলের হয়ে অংশ নেবেন দক্ষিণ এশিয়ান প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ, দেশের সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব, জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মনন রেজা নীড়, আন্তর্জাতিক মাস্টার ফাহাদ রহমান ও জিয়ার একমাত্র ছেলে তাহসিন। ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদুর রহমান মল্লিক দীপু এই দলের নন-প্লেয়িং অধিনায়ক হিসেবে যাচ্ছেন। মহিলা বিভাগে রানী হামিদ, মহিলা ফিদে মাস্টার ওয়ালিজা ও আন্তর্জাতিক ক্যান্ডিডেট মাস্টার ওয়াদিফা ছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মহিলা ফিদে মাস্টার নোশিন আঞ্জুম ও মহিলা ক্যান্ডিডেট মাস্টার নুশরাত জাহান আলো। এই দলের অধিনায়কত্ব করবেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন শামীমের স্ত্রী ও ফেডারেশনের নির্বাহী সদস্য মাহমুদা হক চৌধুরী মলি।
৪৫তম অলিম্পিয়াড শেষে মনন রেজা নীড়, ফাহাদ রহমান, তাহসিন তাজওয়ার জিয়া, ওয়াদিফা ও ওয়ালিজা বুদাপেস্টেই আরও দুটি টুর্নামেন্ট খেলবেন। এই টুর্নামেন্টগুলোতে তারা খেলবেন বিভিন্ন নর্মের প্রত্যাশা নিয়ে। আজই উড়াল দেবেন বুদাপেস্টের উদ্দেশ্যে। তবে নিয়াজ মোরশেদ আগেই ইউরোপে পৌঁছে গেছেন। আগামীকাল তিনি দলের সঙ্গে যোগ দেবেন। এছাড়া ফিদের কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পদাক শাহাবুদ্দিন শামীম ও আন্তর্জাতিক বিচারক হারুনুর রশীদ দলের সঙ্গী হচ্ছেন ফিদের আমন্ত্রণে। আর অতিথি হিসেবে নিজ খরচায় যাচ্ছেন প্রয়াত জিয়ার স্ত্রী ও তাহসিনের মা তাসমিন সুলতানা লাবণ্য ও নিয়াজ মোরশেদের স্ত্রী।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশের হাঙ্গেরিতে অংশ নেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ফেডারেশনের সভাপতির পদটি শূন্য হয়ে পড়ায় হাঙ্গেরি-যাত্রা নিয়ে শঙ্কা জেগেছিল। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শামীম বলেন, ‘অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবং আমরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে খেলোয়াড়দের পাঠাচ্ছি। এবারের দাবা অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য কেবল খেলোয়াড়দের বিমান ভাড়া, পকেট মানি, এন্ট্রি ও রেজিস্ট্রেশন ফি ও ব্লেজার-সহ প্রায় ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। দাবা ফেডারেশনের কর্মকর্তারা এবং সহযাত্রীদ্বয় সম্পূর্ণ নিজ খরচে অংশ নিচ্ছেন।’
এদিকে দুই বোনের এক সঙ্গে স্বপ্নপূরণ হতে যাচ্ছে অলিম্পিয়াডের। এর মধ্যে ওয়ালিজা আহমেদ বাংলাদেশের মহিলা দাবায় উঠতি দাবাড়ু। শেষ দুটি অলিম্পিয়াডেও ছিল তার নাম। তবে নানা কারণে একটিতেও খেলা হয়নি তার। এবার বোনসহ অলিম্পিয়াডে যাচ্ছেন বলেই উচ্ছ্বসিত ওয়ালিজা, ‘২০২০ সালে করোনার জন্য অলিম্পিয়াড হয়নি। ২০২২ সালে পরীক্ষার জন্য যেতে পারিনি। এবার যখন অলিম্পিয়াড নিশ্চিত হলো তখনো অনিশ্চয়তা ভর করছিল। দেশের এই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত যাওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আগামীকাল রওনা হচ্ছি বোনকে সঙ্গী করে।’ ছোট বোন ওয়াদিফা আহমেদ মহিলা দাবায় তৃতীয় হওয়ায় অলিম্পিয়াড নিশ্চিত ছিল। পঞ্চম স্থানের জন্য ওয়ালিজাকে রানী হামিদের সঙ্গে প্লে-অফ খেলতে হয়েছে। ওয়ালিজা সেই প্লে-অফ জিতে জায়গা করে নেন দলে। বোন সঙ্গী হওয়ায় খুশি ওয়াদিফাও, ‘আপু যখন জিতল তখন আমি খুশিতে লাফিয়েছি। দুই বোন এক সঙ্গে অলিম্পিয়াড খেলব এর চেয়ে আনন্দ আর হয় না।’
সাবেক জাতীয় দাবাড়ু বাবা মঈনউদ্দিন আহমেদের দুই মেয়েই এখন বড় দাবাড়ু হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আর তাদের বড় অনুপ্রেরণা হয়ে যাচ্ছেন ৮২ বছরের রানী হামিদ। যদিও জাতীয় দাবায় তিনি সেরা পাঁচে জায়গা পাননি। ওয়ালিজার কাছে প্লে-অফেও হেরে বসেছিলেন। তবে জাতীয় দাবায় দ্বিতীয় হওয়া মহিলা ফিদে মাস্টার শারমিন সুলতানা শিরিন পারিবারিক কারণে সরে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশ দলে জায়গা হয় রানী হামিদের।
রবিবার সংবাদ সম্মেলনে মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন। সদ্য বাবাকে হারানোর শোক এখনো কাটাতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর তিনদিনের মধ্যে তাকে খেলতে হয়েছিল প্লে-অফ। সেটা উতরে হাঙ্গেরির টিকিট পেলেও বাবাকে হারানোর দুঃখ কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না এই তরুণ, ‘বাবা নেই এখনো মানতে পারছি না। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল আমি যেন যেতে পারি। আমি ঠিকই যাচ্ছি কিন্তু বাবা নেই।’
প্রতিবারের মতো এবারও প্রস্তুতিতে ব্যাপক ঘাটতি নিয়ে অলিম্পিয়াডে অংশ নেবেন বাংলাদেশের দাবাড়ুরা। ফেডারেশন তাদের প্রস্তুতির জন্য ভালোমানের কোনো বিদেশি কোচের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এমনকি ফিদের কাছ থেকে বিনে পয়সায় কোচ পাওয়ার সুযোগটাও তারা কাজে লাগায়নি। গতবার ওপেন বিভাগে বাংলাদেশ ১৮৮টি দেশের মধ্যে ৬৬তম এবং মহিলা বিভাগে ১৬২টি দেশের মধ্যে ৫৬তম হয়েছিল। এবার দুদলেরই লক্ষ্য সেরা পঞ্চাশে থাকার। একই সঙ্গে বেশ কজন তরুণ দাবাড়ুর বিভিন্ন নর্ম অর্জনের বাড়তি লক্ষ্যও থাকবে হাঙ্গেরিতে।