আর্জেন্টিনার ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে নতুন বিশ্বসেরা হয়েছে স্পেন। গত রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের নাটুকে লড়াইয়ে ফেররান তোরেসের জয়সূচক গোলে কানবেরা ও উত্তর আমেরিকার এই বৈশ্বিক আসরের মুকুট নিজেদের করে নেয় লা রোহা। তবে রেফারি স্ল্যাভকো ভিনচিচের শেষ বাঁশির পরপরই মাঠের চিত্র বদলে যায় রণক্ষেত্রে।
স্প্যানিশ ফুটবলাররা যখন দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে উঠছিলেন, তখন মাঠের ঠিক মাঝখানেই চরম হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে দুই দল। যেখানে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়, আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। তিনি স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরার পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড় গাভিকে রীতিমতো কুস্তির কায়দায় মাটিতে আছড়ে ফেলেন। ওদিকে ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রির দিকে তেড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘তোমরাই তো পুরো সপ্তাহজুড়ে (রেফারিং আর আমাদের খেলা নিয়ে) কেঁদেছ!’
পরিস্থিতি যখন চরম কেলেঙ্কারির রূপ নিচ্ছিল, তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন আর্জেন্টিনা দলের হেড কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি এক দৌড়ে মাঠের মাঝখানে এসে উত্তেজিত খেলোয়াড়দের বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, ‘এটা একদমই নয়, এটা করা যাবে না।’ একদিকে তিনি যেমন নিজের ফুটবলারদের টেনে সরিয়ে আনেন, তেমনি স্পেনের খেলোয়াড়দেরও শান্ত করেন। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি সোজা এগিয়ে যান তার চিরজনম ও শ্রদ্ধেয় গুরু, স্পেনের ডিরেক্টর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দিকে এবং তাকে জড়িয়ে ধরে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে আজ এই ফাইনালে এসেছি তা নিয়ে আমার অনেক কিছুই বলার আছে। কিন্তু এখন আর সেসব নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। এই ছেলেদের প্রতি আমার চিরকৃতজ্ঞতা, যারা আমাদের আরও একটি বিশ্বকাপের ফাইনাল উপহার দিয়েছে এবং ম্যাচের শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই করেছে।’
স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব অকপটে স্বীকার করে নিয়ে এই মাস্টারমাইন্ড আরও বলেন, ‘আজ ওরা আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে এবং এটাই সত্যি। তবে এই দলটি ফাইনালে আসতে যে কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছে, আমি সবসময় তাদের সেই লড়াকু রূপটাই মনে রাখব। আমাদের এই রানার্সআপ হওয়ার জার্নিটাকেও বড় করে দেখা উচিত, কারণ বিশ্বমঞ্চে ফাইনাল খেলা মুখের কথা নয়।’
লিওনেল মেসির অবসর প্রসঙ্গে স্কালোনি স্পষ্ট করে বলেন, মেসি যতদিন চাইবেন, ততদিন খেলা চালিয়ে যাবেন, ‘ আমার কাছে এটা একেবারে পরিষ্কার যে, ও (মেসি) যতদিন না থামার সিদ্ধান্ত নেবে, ততদিন খেলে যাবে এবং দল সবসময় ওকে সমর্থন করবে। আমি আশা করি সবাই ওর জন্য গর্ববোধ করবেন। ও যা অর্জন করেছে তার জন্য সবার গর্বিত হওয়া উচিত, কারণ ও ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’
সবশেষে নিজের দেশ ও সমর্থকদের এক অনন্য বার্তা দিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমি দলের সব খেলোয়াড়কে ধন্যবাদ জানাই এবং দেশবাসীকে বলতে চাই যে, আমরা মাঠে আমাদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। আজকে ছেলেরা যেভাবে লড়াই করেছে, তা আমাদের দেশের মানুষের জন্য একটি বড় উদাহরণ। ফুটবল বা জীবনে কখনো কখনো হার আসতেই পারে, কিন্তু সেখান থেকে আবার উঠে দাঁড়ানোটাই আসল কথা। আমরা জয়ে যেমন বড় মনের পরিচয় দিয়েছি, পরাজয়েও আমাদের সেই মহত্ত্ব দেখাতে হবে। আমরা আজ হেরেছি এবং তা মাথা পেতে নিচ্ছি।’