আশুলিয়ায় আজও ৮০ পোশাক কারখানা বন্ধ

শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বেতন, হাজিরা বোনাস, টিফিন বিল বৃদ্ধি, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধসহ, নানা দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) জামগড়া, নরসিংহপুরসহ আশপাশের অধিকাংশ কারখানা ছুটি ও বন্ধ ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

সোমবার দুপুর ২টা পর্যন্ত অন্তত ৮০ টি কারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্পাঞ্চল পুলিশ। তবে সাভারের অন্য এলাকার কারখানাগুলোয় শ্রমিকেরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া শ্রমিকদের দাবি পূরণ করতে না পারায় আগে থেকেই অনেক কারখানার ফটকে কারখানা বন্ধ ও ছুটির নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

তবে শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো সড়ক অবরোধ কিংবা কারখানায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ কারখানাতেই উৎপাদন স্বাভাবিক আছে। তবে আগে থেকেই কিছু কারখানায় অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল সেসব কারখানার শ্রমিকরাও কাজে না ফেরায় কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করেছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার সামনে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি সড়কে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব ও এপিবিএন সদস্যরা।

শিল্প মালিকরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্প অস্থিতিশীল করে তুলতে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় নানা অজুহাতে আন্দোলন ও কারখানা ভাঙচুর শুরু করে দুর্বৃত্তরা। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে পড়বে পোশাক খাত। ফায়দা নিতে ওত পেতে আছে বেশ কিছু দেশ।

আশুলিয়ার এস. সুহি ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড কারখানার মানবসম্পদ এবং কমপ্লায়েন্স বিভাগীয় প্রধান সাইফুদ্দিন মিয়া বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও পরোক্ষভাবে উপকারভোগী কমপক্ষে দুই কোটি মানুষ। যারা বিভিন্ন কায়দায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে আমার মনে হয় তারা শ্রমিক না। একটি গোষ্ঠীর হয়ে পরিকল্পিতভাবে দেশের পোশাক খাতকে ধ্বংস করার পায়তারা চালাচ্ছে। ৪০-৫০ জন লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে আমরা শ্রমিকদেরকে বিভিন্নভাবে কাউন্সিলিং করে কাজে রাখার চেষ্টা করছি। সরকার এবং প্রশাসনেরও উচিত শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা। প্রতিদিন আমাদের কমপক্ষে ৫০ হাজার পিস পোশাক উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডারকৃত মালামাল বুঝিয়ে দিতে না পারলে তারা আমাদের দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাতে করে এই শিল্প পাশের দেশ ভারতে চলে গেলে বিপদে পড়লে বিশাল জনগোষ্ঠী। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।

ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলেন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লেনী ফ্যাশন ও লেনী অ্যাপারেলস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় কারখানা দুটির শ্রমিক, কর্মকর্তা—কর্মচারীদের বেপজার পক্ষ থেকে যে কোনো একটি কারখানা বিক্রি করতে পারলে সেই টাকা দিয়ে সবার বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ৬ মাস আগে একটি কারখানা ৮৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। আমাদের পাওনা ৬৬ কোটি টাকা। বিক্রির টাকা ব্যাংকে জমা থাকলেও আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান চাই।

অন্যদিকে সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভের সংবাদ সগ্রহের সময় টেক্সটাইল ও পোশাকবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেক্সটাইল টুডের এক প্রতিবেদক ও দুই ফটো সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকাল ১০ টার দিকে আশুলিয়ার টেক্সটাউন গ্রুপের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় আহতরা হলেন প্রতিবেদক এম এ মোহাইমিন তানিম এবং ফটো সাংবাদিক ইমন পাটোয়ারী ও আশরাফুল আলম। এদের মধ্যে ইমন পাটোয়ারী গুরুতর আহত হয়েছেন।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলটিতে আজ বন্ধ রয়েছে ৮০-৯০টি কারখানা। মূলত শ্রমিকদের দাবিগুলোর বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় আগে থেকেই কয়েকটি কারখানায় বন্ধ ও ছুটির নোটিস টাঙিয়ে দেয়। এছাড়া কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ না করায় সেগুলো ছুটি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য কারখানাগুলোতে উৎপাদন চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি মাঠে কাজ করছেন বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

জানতে চাইলে র‌্যাব-৪, সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর জালিস মাহমুদ খান বলেন, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে শ্রমিকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। তারা র‌্যাবের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টাসহ ভাঙচুর করেন। সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েন। আমাদের টিম ছায়া তদন্ত করছে। শিল্পাঞ্চলে যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতি তৈরির চেষ্টা করছে যেসকল দুষ্কৃতিকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।