আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতিকরণের মচ্ছপ চলেছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য মেয়র, নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী পর্যন্ত ক্রীড়াঙ্গনে ঢুকিয়ে পড়েছিল বড্ড বাজেভাবে। মনোনয়নের সুযোগ থাকায় ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদগুলো অনেকেই আঁকড়ে ছিলেন রাজনৈতিক পরিচয়ে। তাদের দায়িত্ব নেওয়াই সাড়া। খেলাকে এগিয়ে নিতে তাদের কোন আগ্রহই ছিল না।
অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েই ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। যার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার এক যোগে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ৪২টি ক্রীড়া ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ও সংস্থার সভাপতিদের। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই পদে ছিলেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে।
সভাপতি পদে যোগ্যতার চেয়ে কাছের ও নিজেদের লোককেই বিবেচনা করা হয়েছে এতদিন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অ্যাডহক কমিটি গঠনেও আওয়ামী ঘরনার মানুষদের গুরুত্ব দিয়েছে। সভাপতি পদে এই দেড় দশকে মনোনয়ন পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন বেশ ক'জন সাবেক মন্ত্রী। নীতি নৈতিকতা ভুলে ক্রীড়া মন্ত্রী হওয়ার পরও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব ছাড়েননি নাজমুল হাসান পাপন। সরকার পতনের পর এই ব্যক্তি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে সাবেক ক্রিকেটার ফারুক আহমেদকে দেওয়া হয় দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া কর্নেল (অব.) ফারুক খান ছিলেন স্কোয়াশ ফেডারেশনের সভাপতি। এছাড়া টেনিস ফেডারেশনের সভাপতি করা হয়েছিল সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে। ক্যারমের দায়িত্ব আকড়ে ছিলেন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এছাড়া হাসিনার আগের আমলের শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনি ছিলেন খিউকুশিন কারাতে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। এর বাইরে হাসিনার সময়ই মন্ত্রীত্বের স্বাদ পাওয়া জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু ছিলেন মার্শাল আর্ট কনফেডারেশনের সভাপতি।
জুডো ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন ফয়জুর রহমান সাবেক এমপি, তায়কোয়ানদো ফেডারেশনের ধানমন্ডি থানা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মোর্শেদ হোসেন কামাল, ভলিবলের সভাপতি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, কুস্তির সভাপতি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খান। বাস্কেটবল ফেডারেশনকে অকার্যকর করে রাখতে বড় ভূমিকা ছিল দীর্ঘদিনের সভাপতি ও সাবেক এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের।
এছাড়া আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আবাহনী লিমিটেডের পরিচালক শেখ বশির আহমেদ মামুন ছিলেন জিমন্যাস্টিকসের সভাপতি। মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব আরা গিনি। রোইংয়ের সভাপতি ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লিগের সভাপতি ও মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো কাণ্ডের অন্যতম হোতা মোল্লা আবু কাওছার। উশুর সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও সাবেক এমপি আবদুস সোবহান গোলাপ, আন্তর্জাতিক তায়কোয়ান্দোর সভাপতি সাবেক এমপি মোজাম্মেল হক, সার্ফিংয়ের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ, মাউন্টেনিয়ারিংয়ের সভাপতি আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ মিজানুর রহমান মানু, চুকবলের সভাপতি চট্টগ্রাম সিটির সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন, জুজুৎসুর সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য ফারুক খন্দকার প্রিন্স।
সরাসরি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও হাসিনাসরকারের কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত অনেক আমলা, বিভিন্ন বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা পেয়েছেন ফেডারেশনের সভাপতির স্বাদ। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সদ্য বিদায়ী মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। সাইক্লিংয়ের সভাপতি ছিলেন সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, রোলার স্কেটিংয়ের সভাপতি সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ।
আমলা থাকাবস্থায় যিনি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানের একাংশ দখল করে বিশাল ব্যায়ে নির্মাণ করেন শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং স্টেডিয়াম। যে স্থাপনাটি নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে রয়েছে অনেক সমালোচনা। বাংলাদেশ ব্রিজ ফেডারেশনের সভাপতি সাবেক আমলা জাহাঙ্গীর আলম। বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সভাপতি তথ্য কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মালেক, টেবিল টেনিসের সভাপতি সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিন। দাবার সভাপতি ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজি বেনজির আহমেদ। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিনি বিদেশে ফেরার আছেন। এছাড়া বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
প্রকৃত সংগঠক নয়, বরং বিগত আওয়ামী সরকারের কাছে রাজনীতিবিদ, সাবেক ও বর্তমান আমলা, বাহিনীর কর্তাদের পদায়ন করে খুশি রাখার দিকেই ছিল ঝোক। যে সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাননি বিগ দেড় দশকে বিভিন্ন সময় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা পাঁচ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী।