শিল্পীর পাশে শিল্পী এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হলেও ঠিক কতটা এগোচ্ছে, সেটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে! তাছাড়া সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অনেক শিল্পীদের নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন। বাদ যায়নি শিল্পীদের রাজনীতি করা নিয়েও নানা মতবাদ আমলে আসছে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন শিল্পীদের রাজনীতি করতে হবে কেন, আবার কেউ বলছেন, রাজনীতি যে কেউই করতে পারে, কিন্তু দলকানা হতে হবে কেন! ন্যায়ের পক্ষে কথা বলবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে এমনটাই হওয়া উচিত। এর মধ্যে শিল্পীদের মধ্যে বৈষম্য নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন। যাকে ঘিরে শিল্পীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভাজন। আর তার প্রভাব পড়ছে শিল্পে, ইন্ডাস্ট্রিতে।
সাম্প্রতিক ইস্যুতে দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে শোবিজ ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও যেন নাজুক। নতুন স্বপ্নের এক মাস পেরোলেও জমজমাট হয়ে উঠতে পারেনি শোবিজ। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন, শিল্পী-নির্মাতাদের অনেকেই কাজ শুরু করতে পারছেন না। এদিকে ছোট পর্দার অভিনয় শিল্পীদের সংগঠন ‘অভিনয়শিল্পী সংঘ’র বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপসহ শিল্পীদের অধিকার আদায়, বৈষম্য এবং শিল্পীদের বিভাজন ও নানা দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন মুক্ত আলোচনা শীর্ষক শিল্পীরা। সবকিছু মিলিয়ে যেন এক অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে।
সার্বিক অবস্থা ও বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন গুণী নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। শিল্পীদের দুই ভাগ হয়ে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের এই বিভাজনটা নিরেশন হওয়া উচিত। এই বিভাজনের কারণে দুপক্ষই ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা কেউ বুঝতে পারছে না। ইন্ডাস্ট্রিতে যদি শিল্পীরা দুইটা দলে বিভক্ত হয়ে যায়, তাহলে আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই দুপক্ষের উচিত হবে এটার দ্রুত সমাধান করা। কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ শিল্পী সমাজ চাই।’
এ বিষয়ে আপনারা সিনিয়র শিল্পীরা কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘আমি অনেকের সঙ্গেই ইতিমধ্যে কথা বলেছি। কিন্তু সবাই তো এই মুহূর্তে উত্তেজিত, আর সবারই নিজস্ব কিছু যুক্তি আছে। প্রত্যেকের একটা রাজনৈতিক আর্দশ আছে, কিন্তু তাই বলে অতিরিক্ত প্রকাশ করা উচিত না। গণতান্ত্রিক দেশে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা উচিত। যদি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলি তাহলে তো সর্বনাশ।’
শিল্পীদের রাজনীতি করা নিয়েও মন্তব্য করলেন এই গুণী। বললেন, ‘রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। তবে আমি দলীয় রাজনীতি বিশ্বাস করি না। অনেকে বিশ্বাস করতে পারে। আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলে কাজ করিনি এবং কোনো রাজনৈতিক আদর্শের প্রচার করিনি। শিল্পী হিসেবে আমি বিচক্ষণ, সমালোচনামুখর। যখনই কোনো সরকার বা দল অন্যায় কাজ করবে আমি তখনই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। শিল্পীদের তাই করা উচিত। শিল্পীরা প্রতিক্রিয়া জানাবে, সোচ্চার থাকবে। যখনই কোনো অন্যায় কিংবা অনাচার হবে তার প্রতিবাদ করবে।’
শিল্পীদের এই বিভাজন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ আরেক গুণী অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান। এই বিভাজন থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের মধ্যে দুইটা গ্রুপ হয়েছে, দুটি পথ বেছে নিয়েছেন তারা। এটা মোটেও ভালো লাগছে না আমার কাছে। আমি বলব তারা যেন ততটা শত্রুতার মধ্যে না যায়, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ থাকে না। যারা বাড়াবাড়ি করেছে, তাদের মধ্যে যদি অনুশোচনাবোধ থাকে তাহলে তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আর যারা অপরাধী তাদের বিচার তো প্রচলিত আইনেই হবে। আমি বলব কাদা ছোড়াছুড়ি না করে, সংলাপে বসতে। সংলাপ বা কথা বলা মানেই তো কমিটমেন্ট নয়। কথা বললেই বিভাজনের পথ থেকে বেরিয়ে আসার পথ পাওয়া যাবে।’
শিল্পীদের বিভাজন নিয়ে চিন্তিত চলচ্চিত্র অভিনেতা সিয়াম আহমেদও। চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের শিল্পীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু সত্য কথা বিভাজনের বিষয় নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার সময় পার করে এসেছি। এখন সবাইকে এক উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে। একজন আরেকজনের মধ্যে বিভাজন সারা জীবন থাকবে। কারও সাদা পছন্দ, আবার কারও কালো পছন্দ। কিন্তু কাজের মধ্যে এসে বৈষম্য করা যাবে না। এই জায়গাগুলো সংস্কার করার জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে যারা মুরব্বি আছেন এবং শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। এই বিভাজন নিরসন একজনের ব্যক্তি দায়িত্বে সম্ভব নয়, বলেও লাভ নেই! সবার মধ্যে যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে একটা সংস্থা সবকিছু ঠিক করে দিতে পারবে না। প্রথম পরিবর্তনটা আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে আসতে হবে।’
শিল্পীর সঙ্গে রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে এই নায়ক আরও বললেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশের সুবিধা কী? আমি যদি কোনো দলকে সরাসরি সমর্থন না করি, সেটা যেমন আমার অধিকার, ঠিক একইভাবে যদি কোনো দলকে সাপোর্ট করি, সেটাও আমার অধিকার। তার মানে আমি তো অন্যদের তিরষ্কার করতে পারব না। কারণ প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা আছে রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা না করার। কিন্তু আমাদের সামনে অনেক উদাহরণ আছে যারা তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমান সময়ের মানুষ অনেক আধুনিক। তারা বোঝেন কোনটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটা দেশে যেখানে ছাত্ররা মারা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে একটা বক্তব্য দিয়ে মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করলেই তো সেটা মানুষ গ্রহণ করবে না। কারণ মানুষ এত বোকা না। তারা সত্য-মিথ্যা বেঝে। একজন সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক দলের সমর্থক অবশ্যই চাইবে তার দলকে সমর্থন দিতে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এটা আশা করে না যে, একজন শিল্পী রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলবে। বরং মানুষ চায়, শিল্পীরা পজিটিভ কথা বলবে, আশার বাণী বলবে। পড়াশোনার মাধ্যম ছাড়া যদি কোনো কিছু সহজে বোঝানো সম্ভব হয় সেটা একমাত্র আর্টফর্মের মাধ্যমেই সম্ভব। প্রতিটি সৃষ্টিশীল কাজেই কোনো না কোনো তথ্য থাকে। এটা তো একজন শিল্পী দ্বারাই সম্ভব। যখন শিল্পীরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শিল্পীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতা কমে যায়। আমাদের শিল্পীদের ওপর জনগণের বিশ্বাস কমে গেছে। কিন্তু গুটিকয়েক শিল্পীকে দিয়ে গোটা শিল্পী সমাজকে বিচার করা উচিত না। শিল্পীরা তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতা যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, সেখান থেকে ফিরে আসা এতটা সহজ না। পূর্বের জায়গায় ফিরে যেতে সময় লাগবে।’