ক্রীড়া ফেডারেশনে আসুক যোগ্য অভিভাবক

কারা হবেন ক্রীড়া ফেডারশনগুলোর সভাপতি? দলীয় সরকারের আমল কিংবা সেনাবাহিনী শাসিত সরকার, সভাপতি মনোনয়নে কখনোই ছিল না কোনো যোগ্যতার মানদ-। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সভাপতি মনোনয়ন দেয় সরকার। এই আইনের ফাঁকফোকর গলে দিনের পর দিন অদক্ষ, অযোগ্য, ক্ষেত্রবিশেষে ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেক ব্যক্তিকে দেখা গেছে সভাপতির চেয়ারে। ফেডারেশনের শীর্ষ ব্যক্তির যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া মানে সেই খেলায় নেমে আসে স্থবিরতা। সঠিক পরিকল্পনা-সিদ্ধান্ত নেওয়া, খেলাটা এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ-সংস্কারের ব্যবস্থা করা, আর্থিক পৃষ্ঠপোষক নিশ্চিত করা, সর্বোপরি খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য প্রস্তুত করার মূল দায়িত্ব সভাপতির। অথচ তারাই যখন থাকেন অকার্যকর, তখন সেই খেলাটাও পড়ে থাকে তিমিরেই। এমনটা হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

তবে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে অন্যান্য অঙ্গনের মতো ক্রীড়াক্ষেত্রেও শুরু করেছে সংস্কার। মঙ্গলবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া নেতৃত্বাধীন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় একযোগে অব্যাহতি দিয়েছে ৪২টি ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ও সংস্থার মনোনীত সভাপতিদের। এখন দেখার ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক পদগুলোতে এই সরকার কাদের মনোনয়ন দেয়। ক্রীড়া জগতের মানুষের চাওয়া সংস্কারের হাওয়ায় আসুক বদল, ফেডারেশনের অভিভাবকের পদ দেওয়া হোক যোগ্যতার নিরিখে।

গত এক সপ্তাহের মধ্যে মোট ৪৫টি ক্রীড়া ফেডারেশনের সভাপতিকে অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। আগে থেকেই তিনটি ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদ শূন্য ছিল। পাঁচটি ফেডারেশনের অভিভাবক পদে আনা হয়নি কোনো পরিবর্তন। আর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড স্ব স্ব আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয় বলে সরাসরি পরিবর্তনের সুযোগ নেই সরকারের হাতে।

দেশে সর্বমোট ৫৫টি ক্রীড়া ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ও সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধিভুক্ত। বাফুফে ও বিসিবি বাদ দিলে ৫৩টিতেই সরকার মনোনীত ব্যক্তিরা সভাপতি হিসেবে আসেন। আইনের বাধায় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতে সভাপতি পদে নির্বাচন হয় না। ওই মনোনয়নের প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৩ বছরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন রাজনীতিবিদরা। অব্যাহতির এই যুগান্তকারী ঘটনার আগ পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন পেয়েছেন ২১ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ। যারা সবাই ছিলেন ১৫ বছরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ও তার জোটবদ্ধ বিভিন্ন দলের নেতা। দেখা যায় এদের অনেকের সঙ্গে খেলাধুলার যোগসূত্র একেবারেই নেই। ক্যারম ফেডারেশনে দীর্ঘদিন ধরেই সভাপতি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকারের আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। অথচ কখনই তাকে ফেডারেশনমুখী হতে দেখা যায়নি। এই রাজনীতিবিদরা কেবল পদই আঁকড়ে রেখেছেন। ফেডারেশনগুলো কী করে চলবে, খেলোয়াড়দেরও বা কী অবস্থা, তার কোনো খবর তারা রাখেননি কখনো।

এরপরেই ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বিভিন্ন বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। এর মধ্যে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা যেমন আছেন, গেল কয়েক বছরে খুব করে দেখা গেছে পুলিশ বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্তাদের বিভিন্ন ফেডারেশনে। ক্রীড়াক্ষেত্রে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। তাদের বিশাল ক্রীড়া বিভাগগুলোর কল্যাণে হাজার হাজার ক্রীড়াবিদ চালিয়ে যেতে পারেন তাদের খেলাধুলা। তবে পুলিশের কর্তাদের অধীনে পরিচালিত হওয়া দুটি ফেডারেশনের অবস্থা অথৈবচ। কাবাডি ফেডারেশনের সভাপতি পুলিশ প্রধান। আর দাবার দায়িত্বে র‌্যাব প্রধান। জনপ্রিয় দুটি খেলা গেল কয়েক বছরে এই পুলিশ কর্তাদের অধীনে এক চুলও এগোয়নি।

বিভিন্ন ফেডারেশনে আবার সরকার বসিয়েছে সাবেক ও বর্তমান আমলা, সচিবদের। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর খেলাধুলার এই অতিরিক্ত দায়িত্বে ভীষণ অনীহা থাকে সরকারের এই প্রশাসনিক ব্যক্তিদের। ফলে খেলাটা পড়ে থাকে অবহেলায়। আবার সাবেক হয়ে যাওয়া আমলাদের ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় চলে আসায় সেভাবে অবদানও রাখতে পারেন না তারা। এ রকম ১০ জন সাবেক ও বর্তমান আমলাদের অধীনে থাকা ফেডারেশনগুলোর অবস্থাও ভীষণ করুণ। এছাড়া পাঁচটি ফেডারেশন এতদিন পরিচালিত হয়েছে পাঁচ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। যাদের নেপথ্যে থাকে রাজনৈতিক পরিচয়। এরাও ভাবেন না দায়িত্ব পাওয়া খেলাগুলো নিয়ে। এছাড়া দুজন শিক্ষাবিদ, একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন দুই ফেডারেশনের দায়িত্বে। তারাও ছিলেন নিষ্ক্রিয়। দুটি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে দেখা গেছে প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠক। তবে অপ্রচলিত সেফাক টেকরো ও প্যারা আরচারি অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বে ছিলেন একজন ব্যক্তি কাজী রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপল। তিনি আবার বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনেরও সাধারণ সম্পাদক।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন ২০১৮-এর ২২ ধারায় উল্লেখ করা আছে তফসিল বর্ণিত সংস্থার প্রধান হিসেবে একজন সভাপতি থাকিবেন, যিনি সরকার কর্র্তৃক মনোনীত অথবা, ক্ষেত্রমত, বিধি মোতাবেক নির্বাচিত হইবেন। এখন প্রশ্ন সভাপতি প্রশ্নে কেন এই ধারার মনোনয়ন অংশকেই সরকার অগ্রাধিকার দেয়? ফুটবল, ক্রিকেটের মতো কেন সভাপতি পদেও নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে না সরকার? সেটা হলেও অন্তত গণতন্ত্রের চর্চাটা হতো শীর্ষ পদ থেকেই। তাতে সুযোগ ছিল যোগ্যদের বেছে নেওয়ার। তবে যারা বেছে নেন, সেই কাউন্সিলরদের সততা নিয়ে প্রশ্ন থাকে বলেই সরকার হয়তো মনোনয়নকেই ঝুঁকিমুক্ত মনে করে। আবার দলীয় সরকার যোগ্যতা যাই হোক, ‘কাছের মানুষদের’ পদায়নের সুযোগটাও চায় না হাতছাড়া করতে।

এখন যেহেতু দলীয় সরকারের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নেই, সরকার বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গন এখন তারুণ্যের হাতে, সেহেতু ক্রীড়াক্ষেত্রেও আসুক পরিবর্তন। অভিভাবক হিসেবে যোগ্যদের খুঁজে নেওয়ার ঝক্কিটাই কেবল পোহাতে হবে নতুন ক্রীড়া উপদেষ্টাকে।