প্রতিনিধিত্বহীন স্বেচ্ছাচারী এক সংকলন

বেশিরভাগ সংকলনই সাধারণত একক কোনো ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয় তাতে ব্যক্তির রুচিরই প্রতিফলন ঘটে থাকে। কথাটা আংশিক সত্য, আংশিক এই কারণে যে, ব্যক্তিটি যদি সংকলনের দায়িত্ব পালন না করে কেবলই নিজের রুচির কথা বলেন, তাহলে তার প্রিয় লেখক বা লেখার তালিকাটা হবে এক রকম। আর যখনই তিনি একটি সংকলনের দায়িত্ব কাঁধে নেবেন তখন ওই তালিকা আর এক রকম থাকবে না। যখন তিনি সংকলনের দায়িত্ব কাঁধে নেবেন তখন তিনি জাতি, সংস্কৃতি, সময় ও যুগরুচির প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। ঠিক যেমনটা আমরা বুদ্ধদেব বসুর আধুনিক কাব্য সংকলনের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। তখন তাকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থেকে বৃহত্তর পরিসরের এক বহুস্বর ও বহুল বয়ানের আয়োজনে প্রবেশ করতে হয়। সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দের স্বেচ্ছাচার এড়িয়ে বৈচিত্র্যকে তুলে ধরার তাগিদ থাকে, থাকে বিশেষ একটি প্রবাহের সঙ্গে পাঠককে যুক্ত করার লোহিত-বাসনা। এটি আরও বেশি পালনীয় হয়ে ওঠে যখন বাংলা ভাষার সাহিত্যের একটি সংকলন ভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়। ভিন্ন ভাষায় হলে সেখানে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আপনার পছন্দ হোক বা না হোক, দেশের বরেণ্য কাউকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত না করে উপায় থাকবে না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক আল মাহমুদের কথা। রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি বিতর্কিত, কিন্তু কাব্যিক ঐশ্বর্যের প্রশ্নে তিনি অপরিহার্য। ফলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করতেই হবে যদি আপনি গ্রহণযোগ্য কবিতার একটি সংকলন করতে চান। কিন্তু আমরা সে রকম কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন-ভিত্তিক সংকলনের কথা বলছি না এই মুহূর্তে। বলছি অরাজনৈতিক ভিত্তিতে নির্বাচিত একটি সংকলনের কথা।

এ বছরের শুরুর দিকে আনিসুজ জামানের সংকলনে ও অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ভাষার একটি গল্পগ্রন্থ। বিদেশি ভাষায় আমাদের সাহিত্যের অনুবাদ হওয়া খুবই জরুরি। বহু বছর ধরে আমি এ কথা বলে এসেছি, সংশ্লিষ্ট অনেককে আমি তাগিদও দিয়েছি। ঘটনা হলো ইংরেজিতে মোটামুটি অনুবাদ হলেও, ইউরোপীয় অন্য ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ অতি অপ্রতুল। ফলে, স্প্যানিশ ভাষায় বাংলা গল্পের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে জেনে আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম। বেশি খুশি হয়েছিলাম প্রচ্ছদে স্প্যানিশ ভাষায় সংকলনটির তত্ত্বাবধানে কলম্বিয়ার অগ্রগণ্য তরুণ কথাসাহিত্যিক আন্দ্রেস মাউরিসিও মুনঞস-এর নামটি দেখে। কারণ আন্দ্রেস-এর সাহিত্যরুচি এটিকে সমৃদ্ধ করতে পারত। কিন্তু মূল ভাষার নির্বাচন যদি যথার্থ না হয় তাহলে লক্ষ্য-ভাষার তত্ত্বাবধায়ক এ ক্ষেত্রে কিই বা করতে পারেন। ফলে, হতাশ হতে সময় লাগেনি বইয়ের শিরোনাম আর সূচিপত্রটি দেখামাত্র উভয়ের মধ্যে সামান্যতম সংযোগও নেই। বইয়ের নামটি বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, পদ্মা পাড়ের গল্প। যদি পদ্মা পাড়ের গল্প হয় তাহলে পদ্মার পলিদ্বীপের লেখক আবু ইসহাক এখানে কেন নেই? যদি ধরে নিই যে এটি মৃত লেখক নয়, জীবিত লেখকদের সংকলন, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় তারা কি সবাই পদ্মা পাড়ের বলে সংকলনভুক্ত? ভারতের অমর মিত্র কি পদ্মা পাড়ের? কিংবা দীপেন ভট্টাচার্য? তার মানে পদ্মা পাড়ের লেখকদের সংকলন এটা নয়। তাহলে কি অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সব পদ্মা পাড়ের? না, তাও নয়, কারণ অমর মিত্রের লেখাটি আমি বাংলায় পড়েছিলাম, সেটা পদ্মা পাড়ের হওয়ার কথা নয়। এর কোনোটাই যেহেতু নয়, সুতরাং এটি অনুবাদক ও সংকলক আনিসুজ জামানের একটি স্বেচ্ছাচারপ্রসূত একক নির্বাচন।

কীসের ভিত্তিতে লেখক বা গল্পগুলো নির্বাচন করা হয়েছে তার কোনো স্পষ্ট ভাষ্য নেই। এই সংকলক ও অনুবাদক আমারও একটি গল্প (আমার আবার গল্প!) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিরতিহীন পীড়াপীড়ি করায় তাকে মুখোশের স্বীকারোক্তি নামে একটি গল্প দিতে বাধ্য হই। কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম, আমি মোটেই কথাসাহিত্যিক নই, গল্প যদিও তিন-চারটি লিখেছি কিন্তু ওগুলো আমার বিবেচনায় কিছুই হয়নি। কিন্তু অনুবাদক বন্ধুত্বের অন্ধ-আনুগত্য বোধ থেকে আমার একটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে ছিলেন বদ্ধপরিকর। গত বছর যখন আমি, বন্ধু রাকীব হাসান ও দীপেন ভট্টাচার্য অনুবাদকের বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম, তখন কথা প্রসঙ্গে আমার গল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথা উঠতেই দীপেনদা ও রাকীব কৌতূহলী হয়ে উঠলেন আমার গল্পটি দেখার জন্য। আমি গল্প লিখেছি এটা তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে সলজ্জ কুণ্ঠায় সেটি পাঠ করে শোনাতে হয়েছিল। কিন্তু সূচিপত্রে এখন দেখছি প্রতিশ্রুত সেই গল্পটি নেই। আমি কী যে খুশি হয়েছি আমার গল্পটি না থাকায়! কারণ ওই গল্প ওই সংকলনে থাকা মানে আমাকে ডোবানো এবং আমার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তিকেও চুবানো। তবে আমি না থাকলেও অনুবাদক জ্যাকি কবীর, সালেহা চৌধুরী প্রমুখের গল্প অন্তর্ভুক্ত করে  এ দেশের ভাবমূর্তি ডুবানো থেকে বিরত থাকেননি। কোনো অর্থেই বাংলাদেশের বা বাংলা ভাষার কোনো প্রতিনিধিত্বশীল সংকলন হয়ে ওঠেনি এটি। আপনারা তালিকাটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। এমনকি প্রচ্ছদে ও সূচিপত্রে বাংলা ভাষার মুদ্রিত যে রূপটি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এ থেকেই বুঝতে পারবেন এটি কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিশৃঙ্খল এক সংকলন। এমন নয় যে, দ্বিভাষিক সংকলন করলে এই বর্ণ-বিপর্যয় এড়ানো যেত না। পৃথিবীর বহু প্রকাশনী থেকেই দ্বিভাষিক সংকলন মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে।  সুতরাং সতর্ক ও দায়িত্বশীল হলে এড়ানো যেত। আর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলে বলব আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্বশীল লেখক-লেখিকাদের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে এটিতে খুবই বড় একটা ঘাটতি আছে। ইমদাদুল হক মিলন, ফারুক মঈনউদ্দীন, জাকির তালুকদার, নকীব ফিরোজ, কাজল শাহনেওয়াজ, কামরুল হাসান, মনিকা চক্রবর্তী, নাসরীন জাহান, শাহীন আখতার, প্রশান্ত মৃধা, হামীম কামরুল হক, আহমাদ মোস্তফা কামাল, আফসানা বেগম, অদিতি ফাল্গুনি, ইমতিয়ার শামীম, রায়হান রাইন প্রমুখের গল্প কেন জায়গা পেল না? এরা কেউ প্রতিনিধিত্ব করে না? যদি এরা কেই প্রতিনিধিত্ব না করে, তবে কি জ্যাকি কবির এবং সালেহা চৌধুরী আর আনিসুজ জামান প্রতিনিধিত্ব করেন? নিজে সংকলনের সম্পাদক ও অনুবাদক বলে নিজের দুর্বল লেখা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে? যারা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে এমন সব লেখককে তিনি অন্তর্ভুক্ত করলেন?

সংকলনের অন্য যেসব লেখক আছেন তারা হয়তো খুশি তাদের গল্পের অনুবাদ স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হতে দেখে। কিন্তু আদতে কী অনূদিত হলো তারা কিছুই জানেন না। যার সাহিত্যপাঠ অতি অপ্রতুল, ভাষাজ্ঞান অসাহিত্যিক, সাহিত্যরুচি সংকীর্ণ, তার হাত দিয়ে মূল লেখা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। অথচ তিনি একটু সময় নিয়ে সত্যিকারের সাহিত্যবোদ্ধা কারও সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সুন্দর ও প্রতিনিধিত্বশীল সংকলন প্রস্তুত করতে পারতেন। স্প্যানিশ ভাষার মতো বিরাট এক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রকৃত শক্তির জায়গাটি তিনি উপস্থাপন করতে পারতেন চেষ্টা করলে। বাংলা ভাষায় কথাসাহিত্যে আজকের জীবিত লেখকদের অনেকেই অন্য ভাষায় অনুবাদযোগ্য, কথাসাহিত্যে তাদের অর্জনকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করলে এই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা জাগ্রত হবে। তারা আকৃষ্ট হবে আমাদের সাহিত্যের প্রতি। কিন্তু এ ধরনের সংকলনে ঘটবে ঠিক বিপরীতটাই। অনুবাদক পরিশ্রম করেছেন, তার সদিচ্ছা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জানতে হবে কারা এ দেশের প্রতিনিধিত্বশীল লেখক। তখনই কেবল সফল একটি সংকলন তিনি প্রস্তুত করতে পারবেন। আশা করি, তিনি শিগগিরই ভালো কিছু করবেন।