সাম্প্রতিক সময়ে ‘দুষ্ট কোকিল ডাকে রে, কুক কুক’ এই গান শোনেননি এমন লোকের সংখ্যা কম। এটা শাকিব খানের বক্স অফিস কাঁপানো ‘তুফান’ সিনেমার গান। এই সিনেমার গল্পটা এমন যে গালিবের বাবা গ্রামের জমিদারের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে হত্যার শিকার হন। গালিব এই হত্যার সুবিচার পাননি। বিচারহীনতার ফলাফল হিসেবে সে বড় অপরাধী হয়ে ওঠে। গালিব থেকে সে হয়ে যায় তুফান। সে আইনকানুন নিজের হাতেই তুলে নিয়ে থামেনি, যারা আইন বানায়, সরকার গঠন করে, শাসনব্যবস্থা চালায় তাদেরও প্রভাবিত করেছে অর্থ ও ক্ষমতার বলে। দেখা যাচ্ছে, বিচারহীনতার দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার শেষ পরিণতি তুফান এবং এত এত অপরাধের পরও পুলিশি সহায়তায় সে পালিয়ে যায়। এটা সিনেমার কল্পকাহিনি নয়। এ দেশেই আমরা দেখেছি খুনের আসামি রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তার সহায়তায় দুবাইতে বিশাল স্বর্ণের ব্যবসা পাহারা দিচ্ছে। ফলে গালিব নামক আতরাফ (আরাব নয়) যখন আশরাফ হয়ে ওঠে সমাজে, তখন তার নাম হয় তুফান। যারা জৈব রসায়ন পড়েছেন তারা জানেন বেনজিন (বেনজির নয়) চক্র বেশ শক্তিশালী একটা গঠন। এটা ভাঙতে তাপ, চাপ, শক্তি বেশি লাগে। ফলে আমাদের সমাজের আইন ও বিচার ব্যবস্থা, তার প্রয়োগ ব্যবহার, অপরাধ দমন প্রক্রিয়া বোঝার জন্য পরিশীলিত নান্দনিক গজ ফিতায় মাপা আর্ট ফিল্ম টাইপ কিছু থেকে ‘তুফান’ নামক কমার্শিয়াল ফিল্ম অনেক প্রাসঙ্গিক। সমাজ বোঝার জন্য মব বা হুজুগে পাবলিকের সংস্কৃতির কাছে আপনাকে যেতে হবে।
একইভাবে বিচারহীনতার সমাজিক ও মানসিক প্রভাব বোঝার জন্য আশি বা নব্বই দশকের জসীমের অনেকগুলো সিনেমাও আপনি দেখতে পারেন। ‘তুফান’-এ শেষ মুহূর্তে পুলিশ অন্যায়কারীকে সেফ এক্সিট দেয়, যা আমাদের বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপকভাবে চর্চা করা হয়েছে। কিন্তু জসীমের সিনেমায় আপনি শেষ দৃশ্যে পুলিশকে পাবেন মহান ডায়ালগ নিয়ে উপস্থিত, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’ এখানে সাংস্কৃতিকভাবে ধরে নেওয়া সুযোগ আছে যে, আইন বলে কিছু একটা আছে। কিন্তু তুফানে আপনি জানবেন আইন, বিচার হলো ধোঁকা। ফলে আমরা বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে জসীম থেকে শাকিব দশায় উপনীত হয়েছি বছরের পর বছর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে।
২
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ন্যায়বিচার, সমতা, সমানাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক বিষয়গুলো থেকে বঞ্চিত ছিল। জনতার অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ৫ আগস্ট থেকে মানুষ একটা আশার আলো পেয়েছে। দেশে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হলেও রাজনৈতিক মুক্তি ঘটলেও সামাজিক, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনির্মাণ এখনো সম্ভব হয়নি। আমরা এখনো জানি না থানা, পুলিশ, প্রশাসন কাজ করে কিনা। বিচারব্যবস্থা সচল কিনা। ফলে সমাজে সামগ্রিকভাবে একটা আস্থাহীন অবস্থা বিরাজ করছে। এই অনিশ্চয়তার বোধ মানুষকে গালিব থেকে তুফান করে তুলতে সহায়তা করেছে। মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। থানা, পুলিশ, আইন-আদালতের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আমরা যত দ্রুত ফেরাতে পারব, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ও সম্ভাবনা কমবে। গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে অর্জিত জনগণের সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। নৈরাজ্য দিয়ে রাষ্ট্র চলতে পারে না।
৩
‘মব জাস্টিস’ বা ‘হুজুগে বিচার’কে সঠিক হিসাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই এবং দৃঢ়ভাবে এটা বলা দরকার যে, হুজুগে বিচার বেআইনি কাজ। যার যা করার অধিকার নাই, সে তা করলে শুদ্ধিকরণ তো হয়ই না, বরং সমাজে অন্যায় বাড়ে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, একশ লোকও যদি ভুলকে সঠিক বলে আর একজন ব্যক্তি যদি তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে তাকে সে সুযোগ দিতে হবে। সাম্য হলো বহু লোক মিলে যে ওজন, তা একক ব্যক্তির ওজনের সমান হতে পারে, এমনকি একক ব্যক্তির ওজন একশ লোক থেকে শতগুণ বেশি হতে পারে। সমতার অঙ্কে একশ সমান এক খুব ঠিক আছে। বিচারব্যবস্থা হলো সেই গণিত, যাকে একশ লোকও যদি অপরাধী বলে তবু সে নিরপরাধ হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হতে পারবে। শুধু চিহ্নিতই নয়, আইন ও বিচার তার ক্ষমতায় সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবি থেকে ভগ্নাংশকেও নিরাপদে রাখে। এটাই বিচারিক শক্তি ও যৌক্তিকতা। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর ন্যায্যতা ভিত্তিক যে দেশ গঠনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেই প্রত্যাশা থেকে দেশের নানা প্রান্তে খুবই প্রবলভাবে মব জাস্টিস দেখা যাচ্ছে। জনগণ বিচারিক কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও গায়ের জোরকে বিচার বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে বিচারের ন্যায্যতা নষ্ট হয়। হাজার শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশে গঠনের দায়িত্ব তারা আমাদের দিয়ে গিয়েছে, তা মব নামক জনতার হুজুগে অবিচারের কাছে জলাঞ্জলি দিতে পারি না আমরা।
৪
হুজুগে অবিচারের কারণ হিসেবে যদি শুধু দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচারের অভাবকে চিহ্নিত করে থাকি তাহলে বড় একটা বিষয়কে আমরা উপেক্ষা করে যাব। আরও কিছু সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের হিসাবে নিতে হবে। প্রথমত, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সব দলকে একটা সাধারণ বিশ^াসে আসতে হবে যে, মব জাস্টিস আইনিভাবে গুরুতর অপরাধ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হুজুগে বিচারের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক। ফলে এই দায় বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক দলগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। বিগত পনেরো বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অসুস্থতা এক মাস বা দুই মাসে সমাধান হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশার কোনো কারণ নেই। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত কোনো অবস্থান ও বক্তব্য নেই। তাদের নিজের স্বার্থে এটা করা তাদের জন্য কর্তব্য।
হুজুগে বিচার মূলত অপরাধ। আধুনিক অপরাধ বিজ্ঞানের নানা গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, শুধু বিচারক কার্যক্রম দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। নৈতিকভাবে সবল মানুষও সুযোগে অপরাধ করে ফেলে। এর অগণিত উদাহরণ পাওয়া যাবে। ফলে অপরাধ দমন মানে শুধু আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নয়। বেশ কিছু কার্যকর কৌশল ও পদ্ধতির বিনিময়ে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেন মানুষ অপরাধের সুযোগ না পায়। আমাদের নানা প্রতিষ্ঠানে বিগত বছরগুলোতে অযোগ্য লোকদের শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়ে ভাবতে হবে। সরকারকে স্পষ্টভাবে জনগণকে জানাতে হবে কত দিনের ভেতর এগুলোয় সঠিক লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। তা না হলে নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকসহ স্কুল-কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে যে ঘেরাও, পদত্যাগ কর্মসূচি ও অরাজকতা দেখা যাচ্ছে তা চলতেই থাকবে। আমাদের পুরো ব্যবস্থাটাকে জনগণের পক্ষে সাজাতে হবে।
৫
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত মব জাস্টিস নিয়ে আলাদাভাবে বলা আবশ্যক। শিক্ষকের কাছে ছাত্র নিজ সন্তান থেকে কোনো অংশে কম কিছু নয়। কিন্তু আওয়ামী শাসনব্যবস্থা এমন একটা শিক্ষক শ্রেণি তৈরি করেছিল, যারা তাদের ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদ জানাতে পারেননি। সহমর্মিতা পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। বরং কেউ কেউ আক্রান্ত ছাত্রদেরই জামায়াত-শিবির, জঙ্গি ট্যাগ দিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের রক্তের বিনিময়ে হলেও সরকারের তরফ থেকে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা আদায় করা। আর বিজয়ী ছাত্রসমাজ যখন ক্লাসে ফিরেছে তখন দেখেছে, তাদের কিছু সহপাঠী শহীদ অথবা গুলিতে অন্ধ অথবা হাত-পা হারানো। তাদের কাছে আপনি সম্মান আশা করেন কীভাবে? একবার এদের মানসিক অবস্থার কথা ভাবুন। বিপুল একটা জনগোষ্ঠীর ট্রমার কথাটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এই যন্ত্রণাদগ্ধ তরুণ প্রজন্ম ও তাদের শোকে কাতর পরিবারগুলো মানসিক সাপোর্টের জন্য আমার কী করেছি? এই ট্রমাটাইজড জনগণের কাছে আমরা কী আশা করতে পারি!
এদের প্রতি আমাদের সহমর্মী হলেই চলবে না, তাদের ট্রমা কাটানোর জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট সেন্টার খুলতে হবে। আমাদের কাজটা এই মুহূর্তে শুধু রাজনৈতিক নয়; সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে হবে। এই প্রজন্মকে বুকে আগলে ধরুন। এই হারানোর যন্ত্রণা থেকে তাদের মুক্তির পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করুন। আমাদের সন্তানদের হিলিং করতে না পারলে আমাদের বিরাট একটা প্রজন্ম অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
৬
মানুষ মূলত একটা দীর্ঘ সময় ধরে জেলখানায় ছিল। মানুষকে একত্রিত হতে দেওয়া হয়নি। একমুখী বিশ্বাস ছাড়া কিছু বলতে দেওয়া হয়নি। উদ্যান, পার্ক, জমায়েতের জায়গা, মিছিল, মিটিং, অনুষ্ঠান সব কিছুই প্রায় বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আমাদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জীবে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। মানুষ একত্রিত না হলে আস্থা, বিশ^াস তৈরি হয় না। প্রাণী হিসেবে মানুষ আস্থাহীন অবস্থায় প্রাথমিকভাবে যা করে তা হলো সার্ভাইভাব। অপরকে ধ্বংস করে হলেও নিজে বাঁচতে চায় আগে। এই ঘটনাই ঘটছে চারপাশে। অন্যকে দমনের ভেতর দিয়ে নিজে রক্ষা পেতে চাচ্ছে। ১৫ বছরের রাজনৈতিক অনাচারের সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট এইটা। ফলে কেউ কেউ ভাবছে দেশে মাজার থাকলে তাদের অস্তিত্ব ও ধর্ম রক্ষা হবে না। ফলে ভেঙে ফেল। কেউ ভাবছে এই জাতীয় সংগীত বা পতাকা থাকলে তাদের টিকে থাকা হুমকিগ্রস্ত হবে। কেউ ভাবছে কোনো একটা গেমে নিজের মতের বিরুদ্ধে কেউ থাকলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে নিজেকে বা নিজের মতো মানুষ ছাড়া সব কিছু হটিয়ে দাও। দেশে একটা নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। সত্য কথা হলো, বড় পরিবর্তনের পর মানুষের এমন আচরণ অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
নানা মতের মানুষকে একসঙ্গে বসার ও কথা বলার স্পেস তৈরি করতে হবে। যখন এরা দেখবে কেউ কারও অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়, সমাজ ডায়ভার্সিফাইড ও ইনক্লুসিভ হলে তাদের সামাজিক ও নাগরিক সুবিধা কমে না, বরং বাড়ে এগুলো উপলব্ধি করলে এসব সামাজিক হইচই কমে আসবে। আমাদের অন্যতম কাজ মানুষকে একত্রিত হতে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা, যাতে আমরা পরস্পরকে আগের থেকে অনেক বেশি বিশ্বাস করতে ও ভালোবাসতে পারি। লাঠি-বন্দুক নিয়ে এর সমাধান হবে না। মানুষকে কাছে আসতে দিন এক অন্যের। আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চাই, যেখানে সবাই বাংলাদেশি হিসেবে নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা পাবে।
লেখক: কবি ও অনুবাদক
mridulmahbub@gmail.com