‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনে শাস্তি হবে জেনেও সরকার পতনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছি। স্বৈরাচার হাসিনা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের বুকে যেভাবে গুলি চালিয়েছে, এতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। তাই বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গত ১৮ জুলাই দুবাইতে থাকা প্রবাসীরা সরকারের পতনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই মিছিলে অংশ নিই। আমরা চেয়েছিলাম স্বৈরাচার হাসিনা শিক্ষার্থীদের বুকে আর একটাও যেন গুলি না চালায়। আমরা জানতাম প্রতিবাদ করলে রাজতন্ত্র আইনে আমাদের শাস্তি হবে। সেই শাস্তির শঙ্কা উপেক্ষা করেই আমরা আন্দোলনে নেমেছিলাম।’
শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের নিজ বাড়িতে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন আমিরাতের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে আসা ফরিদ আহমদ শাহিন। তিনি পৌর সদরের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আলী আহমেদের ছেলে। গত ৭ সেপ্টেম্বর আমিরাতে দণ্ডিত হওয়ার পর ক্ষমাপ্রাপ্ত ৫৭ জন বাংলাদেশির মধ্যে ১৪ জন দেশে ফিরেছেন; তাদেরই একজন শাহিন।
কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে শাহিন বলেন, ‘কারাগারে যাওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের চিন্তায় ঘুম আসত না। ভাবতাম আইনি প্রক্রিয়ায় কে, কখন বের করবে। কখন পরিবারের কাছে দেশে ফিরব। আল্লাহর অশেষ রহমতে ইউনূস স্যারের (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) প্রচেষ্টায় আমরা জেল থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমানে দেশে আছি। ইউনূস স্যার না থাকলে এত কম সময়ে মুক্তি পেতাম না। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা জানা নেই।’
দেশ রূপান্তরকে শাহীন বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে আমিরাতে আইন মেনে সুনামের সঙ্গে দুবাইয়ে ব্যবসা করেছি। ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো বন্ধ করার দাবিতে ১৮ জুলাই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিই। পরদিন ওই দেশের পুলিশ আন্দোলনরত বাঙালিদের গ্রেপ্তার করে। পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। আমরা খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর কোনো উপায় দেখছিলাম না। সারাক্ষণ পরিবারের দুশ্চিন্তায় সময় কেটেছে। কারাগারে অবিরত চোখের পানি ফেলেছি।’
তিনি বলেন, ‘৪৫ দিন আমার কাছে কয়েকশ বছরের মতো লেগেছিল। সময় ফুরাচ্ছিল না। জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় হঠাৎ একদিন শুনলাম আমাদের মুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বিশ্বাস করুন- সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় পড়ে গেছি। তার কয়েকদিন পর শুনলাম আমিরাতের প্রেসিডেন্ট আমাদের সাধারণ ক্ষমা করে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জীবনে বড় আনন্দের খবর আমার কাছে সেটিই ছিল।’
শাহীন জানান, ৫৭ জনকে সাজা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও দণ্ডিতদের প্রকৃত সংখ্যা ১১৪ জন। তিনি তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান সরকারের প্রতি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সমর্থনে ও শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদে দুবাই, শারজাহ, আজমানের বিভিন্ন এলাকার সড়কে বিক্ষোভ করেছিলেন বাংলাদেশিরা। দেশটির আইনে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় বিক্ষোভ থেকে আটক করা হয় অনেককে। তাদের মধ্যে তিনজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ১১ বছর এবং ৫৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন দেশটির আদালত।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ প্রথম সভাতেই দণ্ডিত বাংলাদেশিদের মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। আইনজীবী নিয়োগ করে শুরু হয় আপিল প্রক্রিয়া। একপর্যায়ে আমিরাতের সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা, পরে ৫৭ বন্দি ক্ষমা পান।