সূচিবেধী চিকিৎসা বা আকুপাংচার হলো শারীরিক ব্যথা ও রোগ নিরাময় করার জন্য ব্যবহৃত এক ধরনের প্রাচীন চৈনিক চিকিৎসাপদ্ধতি। শরীরের বহুসংখ্যক নির্দিষ্ট জায়গায় সরু লম্বা সুঁচ ফুটিয়ে এই চিকিৎসাটি প্রয়োগ করা হয়।
বাত ও ব্যথা
সাধারণ মানুষ বাত-ব্যথাকে একই ভাবেন বা সংজ্ঞায়িত করেন। আসলে বাত- ব্যথা বহুল প্রচলিত শব্দ হলেও বাত হলো প্রগ্রেসিভ রোগ, শরীরে প্রবহমান থাকে আর ব্যথা রোগের উপসর্গ মাত্র। শরীরে নানা কারণে ব্যথা অনুভব হতে পারে। প্রথমে বাত মানব শরীরের গিরাগুলোকে আক্রমণ করে নষ্ট করে ফেলে। ফলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে গিরা বাঁকা হওয়া বা গিরাগুলো নড়াচড়া করতে না পারায় রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। বাত রোগ শুধু গিরার ক্ষতি করে না অন্য অঙ্গগুলোকেও আক্রান্ত করে। এতে নানা ধরনের রোগ তৈরি হয়।
আর ব্যথা রোগের উপসর্গ মাত্র। মানুষের শরীরের বিভিন্ন হাড়, জয়েন্টে ব্যথা বা বিভিন্ন অংশ তথা মাথা, হাত, ঘাড়, কোমর, হাঁটু, কনুই, কবজি, রগ মাংশপেশী ইত্যাদিতে ব্যথা পরিলক্ষিত হয়। দেশের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ ব্যথা রোগে ভুগেন বলে অনেকেই ব্যথা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। তবে নানা কারণে মানুষ ব্যথায় ভুগেন এবং যথাযথ চিকিৎসা না হলে জীবন দূর্বিষহ হয়ে পড়ে।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইসিস
মস্তিষ্কের রক্তনালির মধ্যে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় স্ট্রোক হলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইসিস হয়। এতে আক্রান্ত রোগী স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারে না, শরীরের যেকোনো একদিক বা হাত-পা অবশ হয়ে যায়। অনেক সময় খাবার খাওয়া, কথা বলাতেও অসুবিধা হয়।
চিকিৎসা ব্যবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আকুপাংচারের মাধ্যমে যে ১০১টি রোগের চিকিৎসার সুপারিশ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বাত, ব্যথা ও প্যারালাইসিসের চিকিৎসা। এছাড়া হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) আকুপাংচারের প্রমাণভিত্তিক সুপারিশ করে। আকুপাংচার সারাবিশ্বে সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্যতা পেলেও আমাদের দেশে অনেকের কাছে আকুপাংচার নতুন শব্দ বা নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে পরিগণিত হয়। তাই আকুপাংচার সম্পর্কে আমরা জেনে নিতে চাই।
আকুপাংচার
ট্রাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন বা টিসিএম হলো একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা যা প্রাচীন চীনা দর্শন ও সংস্কৃতির মূল্যবোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে। আকুপাংচার ট্রাডিশন চাইনিজ মেডিসিনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে অনেক রোগ এবং চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে আকুপাংচার স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃত ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর অবদান অনস্বীকার্য। তথ্য-উপাত্ত বলছে প্রায় পাঁচ হাজার বছর বয়স পুরনো চীনা এই চিকিৎসা পদ্ধতির। সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে আকুপাংচার চিকিৎসারও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। ফলে সেবা গ্রহীতাদের কাছে তা দিনদিন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
আকুপাংচার সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে জানা যায়, মানব শরীরের নির্ধারিত আকু পয়েন্টগুলোতে রোগের প্রকারভেদ অনুযায়ী অভিজ্ঞ আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ আকুপাংচার সুঁচ প্রবেশ করিয়ে এর যথাযথ প্রয়োগ ঘটান এবং এর সাথে বিভিন্ন আকুপাংচার সমন্বিত থেরাপি যোগ করে আকুপাংচার চিকিৎসা প্রদান করেন।
লক্ষণীয় যে, আধুনিক আকুপাংচারের ক্ষেত্রে আকুপয়েন্টে সুক্ষ সুঁচ প্রবেশ করিয়ে কিউই শক্তির প্রবাহ পরিবর্তন করা হয়। আকুপাংচারের সাধারণ তত্ত্বটি এই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে, মানব শরীরজুড়ে শক্তিপ্রবাহের বা কিউই নির্দেশন রয়েছে যা সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই প্রবাহের ব্যাঘাত ঘটলে প্রভৃতি রোগ তৈরি হয়। আকুপাংচার চিকিৎসা কিউই বা উজ্জীবনী শক্তিতে পুনরায় ফিরিয়ে এনে রোগীকে সুস্থ করে তোলে।
আকুপাংচার চিকিৎসার প্রয়োগ
স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই রোগ সনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পরীক্ষা- নিরীক্ষা, তথ্য-উপাত্ত, কেস স্টাডির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। প্রতীয়মান হয় যে, প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাতের ধরণ চিহ্নিত করে ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু আকুপাংচারে কোনো ধরনের ওষুধ ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
অনেক রোগীর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বাতের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছেন পাশাপাশি ডিজিজ মডিফাইং অ্যান্টিরিউমেটিক ড্রাগ নিয়েছেন বা অনেকেই স্টেরয়েড–জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেছেন। আবার অনেকে এসব ওষুধে ভালো ফলাফল না পেয়ে বাতের আধুনিক ওষুধ বায়োলজিকালি মেডিসিন গ্রহণ করেও সুস্থ হননি। এর কারণ হলো মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কখনো কখনো আমাদের বিরুদ্ধেই কাজ করে। তাই ওষুধ নির্ভরতার বাইরে বাতের চিকিৎসায় আকুপাংচার খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। বাতের চিকিৎসা প্রটোকলে আকুপাংচার, বাত রোগের ধরণ বা প্রকারভেদ অনুযায়ী আকুপাংচার চায়নিজ থেরাপির পাশাপাশি লাইফস্টাইল মডিফিকেশনকে সংযুক্ত করা হয়। এতে রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠছেন।
সাধারণত বাতের মতোই ওষুধ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের ব্যথার রোগীকে আকুপাংচার চিকিৎসা প্রদান করা হয়। আকুপাংচারে চায়নিজ মেডিসিন থেরাপিসহ ইমিউনিটি সিস্টেম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সংযুক্ত থাকে। আকুপাংচার কোথায় করা হয়; উদাহরণস্বরূপ কারো কোমরে ব্যথা হলে কোমরে, হাঁটুতে ব্যথা হলে হাঁটুতে।
প্যারালাইসিসের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ওষুধ ঝুঁকিমুক্ত করলেও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে না। প্যারালাইসিস পরবর্তী সমস্যাগুলো দূর করে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য আকুপাংচার ও চাইনিজ ফিজিওথেরাপি কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।
আকুপাংচার সেশন
আকুপাংচার চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সেশন ভাগ করা। প্রাথমিক অবস্থায় ১৫টি বা ৩০টি সেশন বা প্রয়োজন সাপেক্ষে হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়।
লেখক: ডা. এসএম শহীদুল ইসলাম
পিএইচডি (পেইন অ্যান্ড প্যারালাইসিস)
পাইওনিয়ার আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ ও
চিফ কনসালটেন্ট, শশী হাসপাতাল (আকুপাংচার)