বৃত্ত ভেঙে শহরমুখী চা বাগানের বাসিন্দারা

১৮৫৪ সালে সিলেটে চা চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে চা-শ্রমিকদের জীবন একটা বৃত্তের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। বাগানের গ-ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের জীবনযাত্রা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শাসনের বেড়াজালে, এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ধীরে ধীরে তাদের জীবনমানের পটপরিবর্তন ঘটছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা বাগানের বাসিন্দাদের মধ্যে শহরের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেতে তারা বৃত্ত ভেঙে শহরমুখী হচ্ছেন।

শ্রীমঙ্গলে একাধিক চা-বাগানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, চা-শ্রমিকদের কেউ কেউ বাগানে কাজ করার পাশাপাশি শহরে গিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। অনেকে বাগানের কাজের ফাঁকে পৌরশহর এলাকায় হকারি কিংবা ব্যবসা করছেন। বর্তমানে অনেক চা শ্রমিক সন্তানরা লেখাপড়া শেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিও করছেন। বিশেষ করে কিছুটা লেখাপড়া জানা চা শ্রমিক সন্তানরা বাগানের স্বল্প মজুরি, কঠোর শ্রমকে আলীঙ্গন না করে বিভিন্ন রিসোর্ট, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণকাজ কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিকের সন্তান সঞ্জয় গোয়ালা। বর্তমানে তিনি শ্রীমঙ্গল শহরে ব্যবসা করছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পরিবারের লোকজন বাগানে কাজ করে সপ্তাহ শেষে যে টাকা উপার্জন করে, বর্তমানে তা দিয়ে জীবন চালানো কষ্টকর। তাই আমি বাগানের কাজে না গিয়ে শহরে এসে ব্যবসা করছি।’

চা বাগানের আরেক বাসিন্দা অনিক সবর শ্রীমঙ্গল শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। তিনি বলেন, ‘আমি বাগানের কাজের পাশাপাশি শহরে এসে কাজ করি। মা-বাবা বাগানে কাজ করতেন, বয়সের কারণে এখন তারা অবসরে। স্ত্রী, দুই সন্তান ও বাবা-মা নিয়ে মোট ছয়জনের পরিবার আমার। শুধু বাগানে কাজ করে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই শহরে এসেও কাজ করছি।’

ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিকের সন্তান সাজন কাহার। তিনি শ্রীমঙ্গল শহরে ফটো স্টুডিওতে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের লোকজন বাগানে কাজ করেন। আমি শহরে এসে ফটো স্টুডিওতে কাজ শেখা শুরু করি। এখন নিজে ফটোগ্রাফি করে থাকি। বাগানের জীবন একটা সীমারেখায় বন্দি। অনেকে চেষ্টা করেও এই সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে না।’

চা শ্রমিক বরুণ র‌্যালী বলেন, ‘আমি একটি চা বাগানের শ্রমিক। বাগানে রাতে পাহারাদারের কাজ করি। দিনে বাড়তি টাকা উপার্জনের জন্য শহরে এসে গাড়ি চালাই। বাগানে সপ্তাহে সাত দিন কাজ করে উপার্জন হয় ১ হাজার টাকা। আর শহরে এসে একটি ট্রিপ দিলেই পাওয়া যায় হাজার টাকা। এসব কারণেই শহরে আসতে হয় আমাদের।’

আমরইল ছড়া চা বাগানের শ্রমিকের সন্তান আপন দাস। তিনি মৌলভীবাজার জেলা তথ্য অফিসে ঘোষক পদে কর্মরত। চাকরির কারণে বর্তমানে তিনি শ্রীমঙ্গল শহরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চা বাগান থেকে অনেকেই শহরমুখী হতে চান। আধুনিক জীবনযাত্রায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চান চা বাগানের তরুণরা। এ কারণে চা বাগানের তরুণদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছেও আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে।’

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নৃপেন পাল বলেন, ‘বর্তমানে অনেকেই শহরমুখী হলেও পরে আবার বাগানে ফিরে আসতে হয়। এর প্রধান কারণ আবাসন সমস্যা। চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চা শ্রমিকদের সন্তানরা কাজের সন্ধানে শহরে গেলেও আবাসন রক্ষার জন্য আবার তাদের বাগানে ফিরে আসতে হয়।’

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তালেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে চা শ্রমিকদের পরিবার ছিল ছোট। এখন তাদের পরিবার বড় হয়েছে। ফলে জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হচ্ছেন তারা। বর্তমানে চা শ্রমিক সন্তানরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। অনেকে নিজ যোগ্যতায় ভালো চাকরি করছেন। সেই বিষয়টিকে আমরা সাধুবাদ জানাই।’